নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জানুন কঠোর নিরাপত্তা প্রস্তুতির সর্বশেষ তথ্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে বলে জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন—সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনই সরকারের মূল লক্ষ্য।
আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় অবস্থিত বিজিবির ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাইতুল ইজ্জতে বিজিবি’র ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তথ্য তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তা প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন কেন গুরুত্বপূর্ণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অপপ্রচারের ঝুঁকি থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই বিশাল সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনের মাধ্যমে—
-
ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে
-
ভোটকেন্দ্র দখল বা প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা কমবে
-
নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রতিরোধ করা সহজ হবে
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে, যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে।
বিজিবির ৩৭ হাজারের বেশি সদস্য মাঠে নামছে
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) থেকে ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এই সদস্যরা দেশের ৬১টি জেলায় মোতায়েন থাকবেন।
বিজিবির এই অংশগ্রহণ নির্বাচনী নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তবর্তী এলাকাসহ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বিজিবির উপস্থিতি নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, বিজিবির সদস্যদের প্রস্তুতি অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তুতির মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।
পক্ষপাতমূলক আচরণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন কোনো অনৈতিক, পক্ষপাতমূলক বা দায়িত্ববহির্ভূত আচরণ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে।
তার ভাষায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। এই নির্দেশনা শুধু বিজিবি নয়, বরং নির্বাচনে যুক্ত সব নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য প্রযোজ্য।
সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা কীভাবে কাজ করবে
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং তাদের সমন্বিত কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী একসঙ্গে কাজ করবে।
এই সমন্বয়ের মাধ্যমে—
-
গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান দ্রুত হবে
-
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি থাকবে
-
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হবে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে।
ভোটারদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে সরকার
সরকারের এই ঘোষণার মাধ্যমে ভোটারদের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—ভোট দিতে গেলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ নিরাপদ পরিবেশ থাকলে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে নিরাপত্তা প্রস্তুতি
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছেও নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা থাকলে নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা বাড়ে।
এ বিষয়ে নির্বাচন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদাহরণ পাওয়া যায় জাতিসংঘের নির্বাচন সহায়তা কার্যক্রম সংক্রান্ত নীতিমালায়, যা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে
অনুষ্ঠানে কারা উপস্থিত ছিলেন
এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন—
-
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সামরিক কর্মকর্তারা
-
বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
-
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা
-
বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ
তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও গুরুত্ববহ করে তোলে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা সেই প্রস্তুতিরই বাস্তব প্রতিফলন।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন বিশ্লেষকরা।




