ফিলিপিন্সে মেয়রের গাড়িতে রকেট হামলা আবারও আলোচনায়। দিনের আলোতে আরপিজি হামলায় চতুর্থবার প্রাণে বাঁচলেন শরিফ আগুয়াকের মেয়র।
ফিলিপিন্সে মেয়রের গাড়িতে রকেট হামলা—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দক্ষিণ ফিলিপিন্সের মাগুইন্দানাও দেল সুর প্রদেশে দিনের আলোতে সংঘটিত এই হামলা দেশটির রাজনীতিতে আবারও সহিংসতার বাস্তব চিত্র সামনে এনেছে। আশ্চর্যের বিষয়, একই মেয়র আগেও তিনবার প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিলেন। সর্বশেষ এই ঘটনায়ও তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
স্থানীয় সময় রবিবার সকাল। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্রে, সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের উপস্থিতির মধ্যেই হঠাৎ রকেটচালিত গ্রেনেড হামলার শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া এই দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।
কে এই মেয়র, যাকে বারবার টার্গেট করা হচ্ছে?
হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মেয়রের নাম আকমাদ মিত্র আম্পাতুয়ান। তিনি ফিলিপিন্সের শরিফ আগুয়াক শহরের নির্বাচিত মেয়র। এলাকাটি মুসলিম মাইন্ডানাও অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত বংশামোরো প্রশাসনিক অঞ্চলের (BARMM) অন্তর্ভুক্ত।
আম্পাতুয়ান পরিবার ফিলিপিন্সের এই অঞ্চলে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিবারকে ঘিরে সহিংসতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিদ্যমান।
দিনের আলোতে কীভাবে ঘটল হামলা?

ফিলিপিন্সে মেয়রের গাড়িতে রকেট হামলা ঘটে সকাল আনুমানিক ৬টা ২০ মিনিটে। মেয়রের কালো রঙের সাঁজোয়া এসইউভি গাড়িটি শহরের বারাঙ্গে পোব্লাসিওন এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্পের কাছে মোড় নিচ্ছিল।
ঠিক সেই সময়, একটি সাদা মিনিভ্যানে করে আসা সশস্ত্র হামলাকারীরা হঠাৎ করেই গাড়িটিকে লক্ষ্য করে রকেটচালিত গ্রেনেড (RPG) নিক্ষেপ করে। বিস্ফোরণে পুরো এলাকা মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কে ছেয়ে যায়।
সাঁজোয়া গাড়িই বাঁচাল মেয়রের প্রাণ
হামলায় মেয়রের এসইউভিটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, গাড়িটি সম্পূর্ণ বুলেটপ্রুফ ও সাঁজোয়া হওয়ায় তিনি গুরুতর আঘাত থেকে রক্ষা পান।
মেয়রের নির্বাহী সচিব আনোয়ার কুইট এম্বলাওয়া বলেন,
“গাড়িটি সাঁজোয়া না হলে আজ আমরা মেয়রকে হারাতাম। ভাগ্যক্রমে, তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন।”
তবে মেয়রের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা বহরের একটি পিকআপ গাড়িতে গুলি লাগে। এতে দুইজন নিরাপত্তাকর্মী আহত হন, যদিও তাদের আঘাত গুরুতর নয়।
আহতদের চিকিৎসা ও বর্তমান অবস্থা
আহত নিরাপত্তাকর্মীদের দ্রুত দাতু হফার-এর বংশামোরো আঞ্চলিক মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের অবস্থা স্থিতিশীল এবং আশঙ্কামুক্ত।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা না ঘটায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসন।
ফিলিপিন্সে মেয়রের গাড়িতে রকেট হামলা: আগেও তিনবার
এই ঘটনাই প্রথম নয়। বরং এটি মেয়র আম্পাতুয়ানকে হত্যার চতুর্থ চেষ্টা।
-
২০১০ সাল – প্রথম হামলা
-
২০১৪ সাল – গুরুতর আহত
-
২০১৯ সাল – আবারও আক্রমণের শিকার
-
২০২৬ সাল – সর্বশেষ আরপিজি হামলা
২০১৪ ও ২০১৯ সালের হামলার পর থেকেই তার গাড়ি সাঁজোয়া করা হয়। সর্বশেষ হামলায় সেই সিদ্ধান্তই তার প্রাণ বাঁচিয়েছে।
এলাকাটির রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট
শরিফ আগুয়াক শহরটির জনসংখ্যা ২০২০ সালের জনগণনা অনুযায়ী ৩৩,৯৮২ জন। এটি ফিলিপিন্সের দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্পর্শকাতর এলাকা, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিদ্যমান।
শহরটির আগের নাম ছিল মাগানোয়। ১৯৯৬ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শরিফ আগুয়াক।
তদন্ত ও তল্লাশি অভিযান
হামলার পরপরই পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ দল এলাকায় বড় ধরনের তল্লাশি অভিযান শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
ফিলিপাইন নিউজ এজেন্সি জানায়, অভিযানের সময় তিনজন সন্দেহভাজন হামলাকারী নিহত হন। তাদের গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একাধিক শক্তিশালী অস্ত্র ও গোলাবারুদ।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না?
এই হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—এমন প্রশ্নে মেয়রের নির্বাহী সচিব সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তিনি বলেন,
“রাজনীতিবিদদের জন্য এ ধরনের ঝুঁকি নতুন কিছু নয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু বলতে চাই না।”
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি নিছক সন্ত্রাসী হামলা নয়; বরং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফল হতে পারে।
দক্ষিণ ফিলিপিন্সে নিরাপত্তা পরিস্থিতি
এই ফিলিপিন্সে মেয়রের গাড়িতে রকেট হামলা আবারও প্রমাণ করে, দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বিশেষ করে বংশামোরো অঞ্চলে:
-
রাজনৈতিক সহিংসতা
-
সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি
-
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
কেন এই ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?
এই হামলা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়। এটি তুলে ধরে—
-
জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা ঝুঁকি
-
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সহিংসতার প্রভাব
-
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
বিশ্ব রাজনীতিতে এসব বিষয় এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি। অপরাধীদের পেছনের মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা গেলে, এটি ফিলিপিন্সের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
একই সঙ্গে, মেয়র আম্পাতুয়ানের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।




