অফিস ফেলে জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা করছেন চাকরিজীবী ও কৃষকরা। অফিস মিস, কাজ ব্যাহত—পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে।
রাজবাড়ীতে জ্বালানি সংকট ঘিরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বুধবার ভোর থেকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড়ের সপ্তবর্ণা ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় অফিসগামী কর্মী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভোররাত থেকেই শতাধিক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তদারকি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে পেট্রল সরবরাহ শুরু হওয়া পর্যন্ত তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতি স্থানীয়দের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি না পেয়ে অফিস মিস: কর্মজীবীদের দুর্ভোগ

বেসরকারি সংস্থার মাঠকর্মী ফরিদা আক্তার প্রতিদিনের মতো সকাল আটটায় অফিসে উপস্থিত হয়ে মাঠে কাজ শুরু করার কথা থাকলেও, জ্বালানি না থাকায় তিনি সকাল সাতটা থেকেই পাম্পে অপেক্ষা করছিলেন।
তিনি বলেন, সকালে সময়মতো অফিসে না পৌঁছালে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়। দিনের কাজ শেষে রাতে তেল নেওয়ার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে ভোরে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। কিন্তু পাম্প কর্তৃপক্ষ প্রথমে সকাল ১১টার কথা বললেও পরে জানায়, ট্যাগ অফিসার আসলে তেল দেওয়া হবে।
এই বিলম্বের কারণে তাঁর কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।
একই সংকটে অন্যরাও
ফরিদা আক্তারের মতোই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক মাঠকর্মী পূজা সেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাইকে জ্বালানি না থাকলে ফিল্ডে যাওয়া সম্ভব নয়, ফলে অফিসের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি জানান, আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিদিনই একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সংসারের দায়িত্ব সামলে ভোরে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষক ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে
শুধু চাকরিজীবীরাই নয়, কৃষকরাও এই সংকটে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তুষার হোসেন নামের এক কৃষক জানান, তিনি তিন দিন ধরে খেতের সেচের জন্য জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, আগের রাতে শুনেছিলেন পাম্পে তেল এসেছে এবং সকালে দেওয়া হবে। কিন্তু সকালে এসে দেখেন দীর্ঘ লাইন। কখন তেল দেওয়া হবে, তা নিয়েও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে তাঁর কৃষিকাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্তদেরও দুর্ভোগ
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী আবদুল খালেক জানান, মঙ্গলবার রাতে খবর পেয়ে ভোরে ফজরের নামাজ শেষে পাম্পে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন পাম্প বন্ধ। পরে কয়েকবার যাতায়াত করেও নির্দিষ্ট সময় জানতে পারেননি।
তিনি বলেন, একবার বলা হয় সকাল নয়টায় তেল দেওয়া হবে, পরে আবার বলা হয় ১১টায় দেওয়া হবে। এতে করে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিও বাড়ছে।
বেতন কাটার শঙ্কায় কর্মজীবীরা
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সানোয়ার হোসেন জানান, তিনি প্রায় আট কিলোমিটার দূর থেকে তেল নিতে এসেছেন। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অফিসে দেরি হয়ে গেছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অফিস কর্তৃপক্ষ দেরির কারণে বেতন কেটে নিতে পারে। অথচ তাঁর গাড়িতে পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার মতো জ্বালানিও নেই। এই পরিস্থিতিতে তিনি কোথায় যাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
রাজবাড়ীতে জ্বালানি সংকট: সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি
ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নজেলম্যান আফজাল হোসেন জানান, মঙ্গলবার রাতে যে পরিমাণ পেট্রল এসেছে, তার প্রায় অর্ধেকই রাতেই শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, অবশিষ্ট তেল ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে দেওয়া হবে এবং সেটিও অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তদারকি কর্মকর্তা, রাজবাড়ী সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন মিয়া উপস্থিত হওয়ার পর পেট্রল সরবরাহ শুরু হয়।
পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র
এই রাজবাড়ীতে জ্বালানি সংকট শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি কর্মসংস্থান, কৃষি উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
- কর্মজীবীরা অফিসে দেরি করছেন
- কৃষকরা সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না
- সাধারণ মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




