রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুনে কক্সবাজারের উখিয়ায় পুড়ে গেছে ৫ শতাধিক ঘর। অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব শত শত পরিবার, তৈরি হয়েছে ভয়াবহ মানবিক সংকট।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুন—এই শব্দগুচ্ছ যেন কক্সবাজারের উখিয়ার বাস্তবতায় নিয়মিত আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। ফের বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে পাঁচ শতাধিক বসতঘর। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আগুনে দিশেহারা হয়ে পড়ে হাজারো রোহিঙ্গা পরিবার। রাতের আঁধারে শুরু হওয়া এই অগ্নিকাণ্ড ক্যাম্পজুড়ে সৃষ্টি করে চরম বিশৃঙ্খলা ও ভয়াবহ আতঙ্ক।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক তিনটার দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা এলাকার ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে বহু পরিবার ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করার সুযোগই পায়নি।
কীভাবে শুরু হলো আগুন
স্থানীয় সূত্র ও ক্যাম্পবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডি-৪ ব্লকে অবস্থিত একটি এনজিও পরিচালিত লার্নিং সেন্টার থেকেই প্রথমে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, রান্নার চুলা বা বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকেই আগুন ছড়াতে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ঘর সাধারণত বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপলের মতো অত্যন্ত দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন আশপাশের ঘর, শেড ও বিভিন্ন স্থাপনায় ছড়িয়ে যায়।
৫ শতাধিক পরিবার নিঃস্ব
রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ আজিজ জানান, এই অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ শতাধিক পরিবার তাদের সবকিছু হারিয়েছে।
তিনি বলেন,
“এক মুহূর্তেই সব শেষ। ঘর, কাপড়, খাবার—কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।”
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। শীতের রাতে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া এসব মানুষের দুর্দশা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
ফায়ার সার্ভিসের চার ঘণ্টার লড়াই
আগুন লাগার খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টার পর ভোরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী,
“ঘনবসতি ও দাহ্য উপকরণের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লেগেছে। প্রাথমিকভাবে রান্নার চুলা থেকেই আগুনের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব জানতে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ জানান, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন,
“পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পাঁচ শতাধিক বসতঘর পুড়ে গেছে।”
অগ্নিকাণ্ডের পর যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাড়ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ঘনবসতি, অস্থায়ী অবকাঠামো, গ্যাস সিলিন্ডার ও রান্নার চুলার অনিরাপদ ব্যবহার এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
গত ২৬ ডিসেম্বর চার নম্বর ক্যাম্পে একটি হাসপাতাল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার আগের দিন কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পে লাগা আগুনে অন্তত ১০টির বেশি বসতঘর পুড়ে যায়। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
মানবিক সহায়তার তীব্র প্রয়োজন
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তা এখন সবচেয়ে জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওগুলো ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, UNHCR এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থা নিয়মিতভাবে ঝুঁকি কমাতে কাজ করলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে।
প্রতিরোধে কী করা দরকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুন প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় জরুরি—
-
আগুন প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি
-
নিরাপদ রান্না ব্যবস্থার বিস্তার
-
ক্যাম্পের ঘরগুলোর মাঝখানে ফাঁকা জায়গা রাখা
-
দ্রুত আগুন নেভানোর সরঞ্জাম সরবরাহ
-
সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করা
এগুলো বাস্তবায়ন না হলে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বারবার ঘটতেই থাকবে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছে। এর ওপর বারবার অগ্নিকাণ্ড তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ঘরহারা মানুষগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আজ রাতে তারা কোথায় থাকবে, কীভাবে খাবার জোগাড় করবে।
এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।




