ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৭টি বিস্ফোরণ, সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত। কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে—জানুন বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শনিবার গভীর রাতে কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আকাশে নিচু দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায় এবং শহরের বেশ কয়েকটি অংশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিস্ফোরণগুলো ছিল শক্তিশালী এবং প্রায় একই সময়ে সংঘটিত। অনেক বাসিন্দা আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। এই ঘটনার পরপরই ভেনেজুয়েলার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের অভিযোগ তোলে।
রাত ২টার বিস্ফোরণ: কী জানা যাচ্ছে

আলআরাবিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রাত প্রায় ২টার দিকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হয়। অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রাত সোয়া ২টার পরও বিস্ফোরণের শব্দ অব্যাহত ছিল বলে জানা গেছে।
বিস্ফোরণের নির্দিষ্ট অবস্থান শুরুতে স্পষ্ট না হলেও, পরে জানা যায়—কারাকাসের কেন্দ্রস্থলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
একই সময় শহরের আকাশে নিচু দিয়ে উড়তে থাকা বিমানের শব্দ আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে।
সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু: প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, কারাকাসে অবস্থিত সামরিক বিমানঘাঁটি লা কার্লোটা এবং প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই দুই স্থানে বিস্ফোরণের ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওগুলোতে বিস্ফোরণের পর আগুন এবং ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা হামলার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশ?
বিবিসির মার্কিন অংশীদার CBS News জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই ঘটনার বিষয়ে অবগত। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি তখনও প্রকাশ করা হয়নি। ওয়াশিংটন সাধারণত এমন ঘটনায় শুরুতে নীরব থাকে—এটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
ভেনেজুয়েলা সরকারের কড়া প্রতিক্রিয়া
হামলার পর ভেনেজুয়েলা সরকার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়—
“ভেনেজুয়েলা তার ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের দ্বারা সংঘটিত অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা জানাচ্ছে।”
এই বিবৃতি স্পষ্ট করে দেয় যে, কারাকাস এই হামলাকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার মতোই দেখছে।
কেন এই হামলা? পেছনের রাজনৈতিক বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—
-
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অবৈধভাবে ক্ষমতায় আছেন
-
তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত
-
ভেনেজুয়েলা ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পরিবহনের অন্যতম কেন্দ্র
এই অভিযোগের ভিত্তিতে ওয়াশিংটন ক্যারিবীয় সাগরে স্পিডবোটে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে।
মাদুরোর পাল্টা অভিযোগ: তেল সম্পদের লড়াই
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা সরকার বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের আসল লক্ষ্য ভিন্ন। কারাকাসের দাবি—
-
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ চায়
-
প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই হামলা
-
এটি একটি পরিকল্পিত শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা
এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: বিশ্ব কী বলছে?
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
-
কয়েকটি লাতিন আমেরিকান দেশ হামলার নিন্দা জানিয়েছে
-
ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে
-
রাশিয়া ও চীন ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সংঘাত বড় আকারের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সাধারণ মানুষের জীবন: আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা
হামলার পর কারাকাসের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার রাতেই নিরাপদ স্থানে সরে যায়। স্কুল, অফিস ও গণপরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা কখনও ভাবেননি রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এমন সামরিক হামলা হবে।
ভবিষ্যৎ কী? বাড়বে কি সংঘাত?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তলানিতে নামিয়েছে।
সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে—
-
আরও সামরিক উত্তেজনা
-
কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়া
-
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার চেষ্টা
-
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়া
পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তের ওপর।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ
বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে [ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা – BBC News] এ।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই হামলা লাতিন আমেরিকার স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
Shikor TV Canada পরিস্থিতির প্রতিটি আপডেট আপনাদের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে তুলে ধরতে থাকবে।




