চাকরি পেতে নেতার ফোন কেন দরকার—এ প্রশ্ন তুলে নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, সুপারিশ ও ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়, সুপারিশ এবং প্রভাবশালী নেতার ফোনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) এক ফেসবুক পোস্টে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থী বাদ পড়া এবং ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে নিজের উদ্বেগের কথা জানান।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—একজন চাকরিপ্রার্থী দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যদি চাকরি পাওয়ার আগে রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব বা কোনো নেতার সুপারিশের প্রয়োজন অনুভব করেন, তাহলে সেটি শুধু একজন প্রার্থীর সমস্যা নয়; বরং পুরো নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
কেন চাকরি পেতে নেতার ফোন—প্রশ্নের কেন্দ্রে নিয়োগব্যবস্থা

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বক্তব্যে চাকরিপ্রার্থীর দীর্ঘ প্রস্তুতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশ নেন, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরে ভাইভাতেও পাস করেন। এরপরও চাকরিতে প্রবেশের আগে যদি তাকে ভাবতে হয় তার পরিবারের কেউ কোন রাজনীতি করেন, স্থানীয়ভাবে কে তার পক্ষে কথা বলবেন কিংবা কোন নেতার কাছে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে যেতে হবে, তাহলে সমস্যাটি কেবল একটি চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
তার মতে, এমন পরিস্থিতি নিয়োগব্যবস্থার কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি জোর দেন, চাকরিপ্রার্থীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হওয়া উচিত তার মেধা ও যোগ্যতা।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশন নিয়ে উদ্বেগ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রসঙ্গও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও বিভিন্ন জেলার বহু প্রার্থী ভেরিফিকেশনের কারণে বাদ পড়েছেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দাবি, বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা অন্তত এক হাজার।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিয়োগের শুরুতে নির্বাচিত প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশনের যে শর্ত জানানো হয়েছিল, সেখানে নাশকতা, সন্ত্রাসী, জঙ্গি বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণকে অনুপযুক্ততার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গ তুলে তিনি নিয়োগের বিভিন্ন ধাপে প্রার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ
সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এর উদ্দেশ্য হিসেবে দক্ষ ও উপযুক্ত জনবল বাছাইয়ের কথা বলা হলেও, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আশঙ্কা ভিন্ন। তার মতে, ভাইভার নম্বরের ওজন বাড়লে রাজনৈতিক প্রভাব, লবিং ও স্বজনপ্রীতির সুযোগও বাড়তে পারে।
সরকারি চাকরির নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশের খবর এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবের কথা উঠে আসে।
তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে মূল গুরুত্ব পেয়েছে এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব এবং নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা।
ভাইভার নম্বর বাড়লে কী নিয়ে প্রশ্ন উঠছে
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মনে করেন, লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী নিজের জ্ঞান, প্রস্তুতি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হওয়ার পর ভাইভার নম্বরের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে চূড়ান্ত বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বেড়ে যেতে পারে।
তার আশঙ্কা, এর ফলে রাজনৈতিক প্রভাব, লবিং কিংবা স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিনি এই বিষয়টিকে শুধু চাকরির পরীক্ষার একটি কারিগরি পরিবর্তন হিসেবে না দেখে নিয়োগব্যবস্থার সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন।
নেতার ফোন ও অ্যাডমিট কার্ড প্রসঙ্গ
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বক্তব্যে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন।
তার দাবি, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশে ওই সংসদ সদস্য বলেছেন, তারা অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে গেলে প্রয়োজনীয় জায়গায় ফোন করে দেবেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে এই ঘটনাটি সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক সুপারিশের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি উদাহরণ হিসেবে এসেছে। তার মূল বক্তব্য হলো, একজন চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও যদি চাকরির জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার ফোনের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তরুণদের ভূমিকা নিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য
নিজের ফেসবুক পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তরুণদের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশের তরুণেরা একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
এরপর তিনি বিএনপির প্রসঙ্গ তুলে সতর্কবার্তা দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপি যদি চাকরির পরীক্ষায় মেধার বদলে দলীয় পরিচয়, সুপারিশ ও নেতার ফোনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনে, তাহলে তরুণেরা এর রাজনৈতিক জবাব রাজপথ ও ব্যালটে দিতে পারে।
এটি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর রাজনৈতিক বক্তব্য; এখানে তার নিজের অবস্থান ও সতর্কবার্তাই তুলে ধরা হয়েছে।
নিয়োগব্যবস্থার সংস্কারকে ‘পরীক্ষা’ হিসেবে দেখছেন
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বক্তব্যে নিয়োগব্যবস্থার সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকলে নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার তার অন্যতম পরীক্ষা।
তার বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো, সরকারি চাকরিতে একজন তরুণের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তার মেধা ও যোগ্যতা। তার বাবার রাজনৈতিক পরিচয়, এলাকার প্রভাবশালী নেতা কিংবা কোনো সুপারিশের ফোন যেন চাকরি পাওয়ার নির্ধারক না হয়—এমন ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
প্রার্থীর নিজের যোগ্যতাই প্রধান পরিচয়—বার্তা
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এমন একটি নিয়োগব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে একজন চাকরিপ্রার্থী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারবেন—তিনি কারও লোক নন, পরীক্ষায় ভালো করেছেন এবং সেই কারণেই চাকরিটি তার প্রাপ্য।
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় ও সুপারিশের পরিবর্তে মেধা এবং যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
চাকরি পেতে নেতার ফোনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তার প্রশ্ন একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ভেরিফিকেশন এবং ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
নিয়োগ সংস্কারের বিতর্কে সামনে যে বিষয়গুলো
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—প্রথমত, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থী বাদ পড়ার প্রশ্ন; দ্বিতীয়ত, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ; এবং তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সুপারিশ ও প্রভাবের সম্ভাব্য ভূমিকা।
সরকারি চাকরির ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত নম্বর কাঠামোর বিস্তারিতও প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিয়োগব্যবস্থাকে মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিচয় বা নেতার সুপারিশের বদলে পরীক্ষার ফল ও যোগ্যতাকে চাকরির প্রধান ভিত্তি করার আহ্বান রয়েছে।
নিয়োগব্যবস্থায় সংস্কার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কীভাবে প্রার্থীদের যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে এই প্রশ্নগুলোই গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি যে অবস্থান তুলে ধরেছেন, তার সারকথা হলো—একজন তরুণের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মেধা ও যোগ্যতা হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব বা কোনো নেতার সুপারিশ যেন সেই মূল্যায়নের বিকল্প না হয়।





