আদালত অবমাননার অভিযোগে তলবের পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় এক মাস সময় চেয়েছেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ ও মামলার বিস্তারিত জানুন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের জেরে আদালত অবমাননার অভিযোগে তলব হওয়ার পর ব্যাখ্যা দিতে এক মাস সময় চেয়েছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। বুধবার (৪ নভেম্বর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার কারণ দেখিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সময়ের আবেদন করেন তিনি। এর আগে ১ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে সশরীরে হাজির হয়ে তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার ফুয়াদের করা মন্তব্য ট্রাইব্যুনালের নজরে আসার পর আদালত অবমাননার বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে বিচারপ্রক্রিয়ায় ‘বস্তায় বস্তায় কিংবা কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে’—এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়েছে আদালত। নির্ধারিত দিনে সশরীরে হাজির হওয়ার পরিবর্তে অসুস্থতার কথা জানিয়ে সময় চাওয়ায় এখন তাঁর আবেদনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আদালত অবমাননার অভিযোগে কী ঘটেছিল?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি এবি পার্টির একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন

দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। সেখানে তিনি বিচারপ্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে মন্তব্য করেন।
তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, বিচারপ্রক্রিয়ায় ‘বস্তায় বস্তায় কিংবা কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে’। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এমন মন্তব্য ট্রাইব্যুনালের নজরে আসার পর বিষয়টি আদালত অবমাননার অভিযোগ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এরপর আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যারিস্টার ফুয়াদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করেন। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে নির্দিষ্ট দিনে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখানে উল্লেখযোগ্য, ফুয়াদের বক্তব্যের সত্যতা বা এর পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে উৎস প্রতিবেদনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। আদালতের পক্ষ থেকে মূলত তাঁর করা মন্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
আদালত অবমাননা: ১ নভেম্বর তলব, ৪ নভেম্বর হাজিরার নির্দেশ
ঘটনাটির ধারাবাহিকতায় ১ নভেম্বর ২০২৬ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক প্যানেল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যারিস্টার ফুয়াদকে তলব করেন।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
আদেশে ৪ নভেম্বর তাঁকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে করা বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
অর্থাৎ, আদালত অবমাননার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সরাসরি শোনার জন্য নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করেছিল ট্রাইব্যুনাল।
তবে নির্ধারিত দিনে তিনি নিজে উপস্থিত হননি। এর পরিবর্তে আইনজীবীর মাধ্যমে সময় চেয়ে আবেদন করেন।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক মাস সময়ের আবেদন
বুধবার (৪ নভেম্বর) ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের পক্ষ থেকে তাঁর আইনজীবী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সময়ের আবেদন জমা দেন।
আবেদনে কারণ হিসেবে তাঁর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এ কারণে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তিনি এক মাস সময় চেয়েছেন।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি তাঁর পক্ষ থেকে সময় চেয়ে করা আবেদন। ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন গ্রহণ করেছেন কি না, অথবা নতুন কোনো তারিখ নির্ধারণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে উৎস প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তাই এক মাস সময় চাওয়ার বিষয়টিকে আদালতের অনুমোদিত সময়সীমা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আবেদনটির বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কী জানিয়েছেন?
ব্যারিস্টার ফুয়াদের হাজিরার নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
তিনি জানান, ৪ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে ফুয়াদকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই নির্দেশের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল তাঁর মন্তব্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিল।
তবে সময়ের আবেদন জমা দেওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে নতুন কোনো বক্তব্য বা পরবর্তী শুনানির তারিখ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উৎস প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগেও দুই আইনজীবীকে তলব করেছিল ট্রাইব্যুনাল
আদালত অবমাননার অভিযোগে ব্যারিস্টার ফুয়াদকে তলব করার ঘটনা একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া ও রায় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগে এর আগে আরও দুই আইনজীবীকে তলব করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া এবং রায় নিয়ে প্রকাশ্যে করা মন্তব্যের বিষয়টি আদালতের নজরদারিতে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হলে তার ভাষা, প্রেক্ষাপট এবং বক্তব্যের ধরন নিয়ে আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও আদালতের পর্যবেক্ষণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
ফুয়াদের ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনাল তাঁর মন্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে। এই পর্যায়ে অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কোনো দণ্ডের তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
আদালত অবমাননার বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আদালত অবমাননা বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ও বিচারিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়। আদালতের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা, পর্যবেক্ষণ কিংবা বক্তব্যের ক্ষেত্রে আইনি সীমারেখা এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে কোনো বিচারাধীন প্রক্রিয়া নিয়ে আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে তোলা হলে তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ ও বক্তব্যের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ব্যারিস্টার ফুয়াদের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁকে তলব করেছে। এর মাধ্যমে আদালত তাঁর মন্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে। তবে এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। কারণ তলব করা, ব্যাখ্যা চাওয়া এবং আদালত অবমাননার অভিযোগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া একই বিষয় নয়।
এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
৪ নভেম্বরের নির্ধারিত হাজিরার দিনে ব্যারিস্টার ফুয়াদ নিজে উপস্থিত না হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে এক মাস সময় চেয়েছেন। ফলে এখন তাঁর আবেদনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি বিবেচনা করে সময় দিতে পারেন অথবা এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন। তবে বাস্তবে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
এ মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ১ নভেম্বর তাঁকে তলব করেছিল এবং ৪ নভেম্বর সশরীরে হাজির হয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার কারণ দেখিয়ে তিনি ওই দিন আইনজীবীর মাধ্যমে এক মাস সময় চেয়েছেন।





