এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (15)
‘এই জার্সি ছিল আমার স্বপ্ন, গর্ব ও জীবন’, বিদায়ের বার্তা মেসির
News Photocard (17)
রোনালদো চাইলে দলে ফিরতে পারেন: পর্তুগাল কোচ
News Photocard (6)
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিন ‘সেভেন-আপ’
News Photocard (15)
নামেই কি শুধু টাইগার, মাঠে কেন এমন অসহায় আত্মসমর্পণ?
News Photocard (9)
সাংবাদিকের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর লিটন, ‘আচ্ছা পদত্যাগ করলাম।’

বিস্ফোরক বিবৃতিতে নিজের শাস্তি চাইলেন রোনালদো

বিস্ফোরক বিবৃতিতে নিজের শাস্তি চাইলেন রোনালদো, পর্তুগাল ক্যাম্প ছাড়ার কারণ, কোচের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, নিজের ভুলের স্বীকারোক্তি ও শাস্তি মেনে নেওয়ার কথা।

পর্তুগালের জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার কারণ নিয়ে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া রোনালদোর বিস্ফোরক বিবৃতিতে ৪১ বছর বয়সী এই তারকা ফুটবলার কোচের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ, নিজের ভুল স্বীকার, সমর্থক ও সতীর্থদের কাছে ক্ষমা এবং সম্ভাব্য শাস্তি মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে শারীরিকভাবে ফিট থাকলে আবারও পর্তুগালের হয়ে খেলতে প্রস্তুত তিনি।

রোনালদোর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর পর্তুগালের জাতীয় দল ছাড়ার বিষয়ে একটি বিদায়ী বার্তা প্রস্তুত করেছিলেন তিনি। তবে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর বর্তমান কোচের বিষয়ে নিজের মতামতও জানতে চাওয়া হয় এবং রোনালদো জানান, তিনি ওই কোচকেই উপযুক্ত মনে করেছিলেন।

কীভাবে শুরু হয়েছিল রোনালদো-কোচের বিরোধ

রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কোচের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে জাতীয় দলের হয়ে তার অংশগ্রহণ নিয়ে একটি পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে তাকে জানানো হয়েছিল, শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ম্যাচে পরিবর্তন আনা হবে। পাশাপাশি নরওয়ে ও ডেনমার্ক সফরে না গিয়ে পর্তুগালে থাকার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

তবে রোনালদো সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তার মতে, বিদেশের মাটিতে দলের সঙ্গে না গেলে সেটি ভালো দৃষ্টান্ত হতো না। আলোচনার পর কোচ তার অবস্থানের সঙ্গে একমত হন।

এই আলোচনায় আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমো কুতিনিও উপস্থিত ছিলেন। রোনালদোর বক্তব্যে, গত মৌসুমে জাতীয় দলের বর্তমান কোচ তার কাছেই জবাবদিহি করতেন এবং ২০২৫ সালে ক্লাবের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রেও কুতিনিওর ভূমিকা ছিল।

আগস্টে হওয়া আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী পরিকল্পনাও এগোতে থাকে। লিসবনে রোনালদোর বাসায় কোচের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক হয়। এরপর আলভালাদে স্টেডিয়ামে ম্যাচ খেলেন রোনালদো। বদলি হওয়ার পর তিনি কোনো আপত্তি জানাননি এবং নিজ হাতে ব্রুনো ফার্নান্দেজকে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরিয়ে দেন।

নরওয়ে ম্যাচে বদলে যায় পরিস্থিতি

রোনালদোর বক্তব্যে নরওয়ের ম্যাচটিই বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উঠে এসেছে।

ম্যাচের দিন দুপুরের খাবারের সময় কোচের সহকারী তাকে জানান, কোচ তার সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর কোচ তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ৩০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত কি না।

রোনালদো তখন মনে করছিলেন, ওই ম্যাচে তিনি খেলবেন না। তার শারীরিক পুনরুদ্ধার ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনাও সেভাবেই চলছিল। তারপরও কোচের অনুরোধে রাজি হন তিনি।

কিন্তু বিরতির পর থেকে ওয়ার্ম-আপ করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠে নামানো হয়নি। রোনালদোর ভাষায়, তিনি অপেক্ষা করেছেন, কিন্তু কেউ তাকে ডাকেনি। তার অভিযোগ, কোচ তখন দেওয়া কথা রাখেননি।

রোনালদো বলেন, তিনি শুধু চেয়েছিলেন সবকিছু জয় দিয়ে শেষ হোক এবং এরপর একা থাকতে। এ কারণেই ম্যাচের পর সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাননি।

এ ঘটনাকে নিজের ভুল হিসেবে স্বীকার করেছেন তিনি। পর্তুগালের সমর্থকদের পাশাপাশি যারা তাকে দেখতে মাঠে গিয়েছিলেন, তাদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন রোনালদো।

রোনালদোর বিস্ফোরক বিবৃতিতে ৮ দফার ব্যাখ্যা

রোনালদোর সঙ্গে কোচের পরবর্তী আলোচনায় আল নাসরের সিমো কুতিনিওও উপস্থিত ছিলেন। রোনালদোর দাবি, সেই বৈঠকে বিষয়টি প্রকাশ্যে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সে বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছিল।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোচ সংবাদ সম্মেলনে সত্য ঘটনাটি ব্যাখ্যা করবেন এবং জানাবেন—রোনালদো কখনো কয়েক মিনিট খেলার দাবিও করেননি। বরং ম্যাচে না নামিয়ে তাকে শুধু ওয়ার্ম-আপ করানো ভুল ছিল বলে স্বীকার করার কথা ছিল।

এ নিয়ে পরে একটি সংক্ষিপ্ত নথিও তৈরি হয়। রোনালদো সেটি অনুমোদন করে কোচের হাতে দেন।

সেই নথিতে মূলত আটটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল:

  1. জাতীয় দলের জন্য রোনালদোকে ঘিরে পরিকল্পনাটি কোচ নিজেই করেছিলেন।
  2. জাতীয় দলের প্রতি রোনালদোর ভালোবাসা ও দীর্ঘদিনের অবদান কোচ জানেন।
  3. রোনালদোর জন্য করা পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন।
  4. কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে রোনালদো কখনো প্রশ্ন তোলেননি এবং পেশাদার আচরণ করেছেন।
  5. নরওয়ের ম্যাচ প্রথম পরিকল্পনায় ছিল না, তবে শারীরিকভাবে সুস্থ মনে হওয়ায় তাকে খেলানোর কথা বিবেচনা করা হয়েছিল।
  6. রোনালদোর মতো খেলোয়াড়কে মাঠে না নামিয়ে শুধু ওয়ার্ম-আপ করানো ভুল হয়েছে বলে কোচ স্বীকার করার কথা ছিল।
  7. কোচ জাতীয় দলে রোনালদোকে চান এবং তার ওপর আস্থা রাখেন।
  8. সমর্থকদের অভিবাদন না জানানো ছিল হতাশার মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া; দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে রোনালদোর সমর্থকদের প্রতি আচরণকে এর মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়।

রোনালদোর দাবি, ওই নথিতে কোচ তার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন—এমন কোনো কথা ছিল না।

দ্বিতীয়বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ

রোনালদোর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো কোচের বিরুদ্ধে তার দ্বিতীয়বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ।

তিনি বলেন, আগের বৈঠকে যে বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বরং তিনি এমন আচরণ ও বক্তব্য শুনেছেন, যা তার কাছে আগের আলোচনার সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হয়েছে।

এ কারণেই আর কোনো প্রতিশ্রুতির অপেক্ষা না করে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

রোনালদোর মতে, মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সত্য যত কঠিনই হোক, তিনি সরাসরি সত্য শুনতে চান।

এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, সংবাদ সম্মেলনের দিন সকালে ফেডারেশনের সভাপতি ও কোচকে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—তারা যদি তাকে জাতীয় দলে না চান, তাহলে যেন সরাসরি জানিয়ে দেন। সে ক্ষেত্রে তিনি সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন।

তার দাবি, দুজনই তখন তাকে জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলে তার জায়গা রয়েছে।

নিজের ভুলও স্বীকার করেছেন রোনালদো

বিরোধের পুরো দায় অন্যদের ওপর চাপাননি রোনালদো। বরং নিজের আচরণের কয়েকটি দিকের জন্য সরাসরি ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

সমর্থকদের অভিবাদন না জানানো এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে আসার বিষয়টি তিনি নিজের ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সতীর্থদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

রোনালদো বলেন, প্রায় ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে কোনো কোচ বা জাতীয় দলের কর্মকর্তার কারিগরি কিংবা কৌশলগত সিদ্ধান্তে তিনি হস্তক্ষেপ করেননি। ভালো বা খারাপ—যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, তিনি সেটিকে সম্মান করেছেন বলে দাবি করেন।

তার মতে, যখন তার সঙ্গে দেওয়া কথা রাখা হয় না, তখন নিজের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে তার মনে হয়েছিল, ক্যাম্পে থাকা দলের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।

নিজের শাস্তি চাইলেন রোনালদো

রোনালদোর বিবৃতির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো নিজের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি।

তিনি বলেন, জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনার পরিণতি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনকে মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাকে শাস্তি দিতে হবে। তার মতে, শাস্তি কমানো উচিত নয়।

এর পেছনে নিজের অধিনায়কত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন রোনালদো। তিনি বলেছেন, তিনি শুধু একজন সাধারণ খেলোয়াড় নন; জাতীয় দলের অধিনায়ক। তাই তার আচরণের গুরুত্বও বেশি।

রোনালদোর বক্তব্য, ব্যক্তিগত মর্যাদা বা অবস্থান যা-ই হোক, ফুটবলে নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

বিদায় নয়, প্রতিযোগিতাতেই মন রোনালদোর

রোনালদোর জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি জানান, বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে অনেক কথা শুনেছেন। ফেডারেশনও তাকে বিদায় জানানোর সুযোগ দিতে চায় বলে তিনি শুনেছেন।

তবে রোনালদো মনে করেন, জাতীয় দলের ক্ষেত্রে তার মূল ভাবনা বিদায় নয়, প্রতিযোগিতা।

তিনি বলেন, সমর্থকদের জন্য ভবিষ্যতে এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ হতে পারে। কিন্তু সেটির জন্য সময় রয়েছে। যতক্ষণ তিনি জাতীয় দলের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে পারেন, ততক্ষণ সেটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের দেশের হয়ে খেলার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার দিনের কথাও উল্লেখ করেন। তখন জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকার কারণে পরের দিনের ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

শাস্তি শেষ হলে আবারও পর্তুগালের হয়ে খেলতে চান

দীর্ঘ বিবৃতির শেষদিকে রোনালদো তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

তার বক্তব্য, তিনি যদি শারীরিকভাবে ফিট থাকেন, ক্লাবের হয়ে খেলতে পারেন এবং গোল করতে পারেন, তাহলে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও পর্তুগালের হয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত থাকবেন।

অর্থাৎ, বর্তমান বিরোধকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা হিসেবে দেখছেন না রোনালদো। বরং তার বক্তব্যে পর্তুগালের হয়ে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জয়ের ইচ্ছাই স্পষ্ট হয়েছে।

সব মিলিয়ে রোনালদোর বিস্ফোরক বিবৃতিতে একই সঙ্গে অভিযোগ, আত্মপক্ষসমর্থন, ভুলের স্বীকারোক্তি, ক্ষমা চাওয়া এবং শাস্তি মেনে নেওয়ার মানসিকতা দেখা গেছে। কোচের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ও আস্থার জায়গায় তৈরি হওয়া সংকটকেই ক্যাম্প ছাড়ার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। একই সঙ্গে জাতীয় দলের দরজা নিজের জন্য বন্ধ করেননি—শাস্তি শেষ হলে আবারও পর্তুগালের হয়ে লড়াই করার প্রস্তুতির কথাই জানিয়েছেন এই তারকা।

সর্বাধিক পঠিত