ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থা নয়, বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বুধবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য, যা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এক বছর তিন মাসেই খেলাপি ঋণের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি গভীর সংকেত দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান
চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী—
-
মোট খেলাপি ঋণ: ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা
-
মোট বিতরণ করা ঋণ: ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা
-
খেলাপি ঋণের হার: ৩৫.৭৩ শতাংশ
এই তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, গত কয়েক প্রান্তিক ধরেই খেলাপি ঋণের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা
২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল—
-
খেলাপি ঋণ: ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা
-
মোট ঋণ বিতরণ: ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা
-
খেলাপি ঋণের হার: ১২.৫৬ শতাংশ
অর্থাৎ মাত্র এক বছর তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে এটি প্রায় তিন গুণ।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি কেন বেড়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতিবিদরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের দিকে ইঙ্গিত করছেন।
দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা
অনেক ব্যাংক এখনো ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করছে।
প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের অনিয়ম
রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাব খাটিয়ে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা বেড়েছে।
ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ
বারবার পুনঃতফসিল করার কারণে খেলাপি ঋণ পরিসংখ্যানগতভাবে দীর্ঘদিন চাপা থাকে।
অর্থনৈতিক চাপ
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও উচ্চ সুদের হার অনেক ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অর্থনীতিতে এর সরাসরি প্রভাব
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো মানে—
-
নতুন বিনিয়োগে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহী হয়ে পড়ে
-
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে ভোগেন
-
সুদের হার বাড়ে
-
সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়
বিশ্বব্যাংকের একটি বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে যে অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে 
ব্যাংকিং খাতের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
এই উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে—
-
কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বাড়ছে
-
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন বাড়ছে
-
আমানতকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংক একীভূতকরণ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ অনিবার্য হতে পারে।
নিয়ন্ত্রণে আনতে কী করা দরকার?
বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব—
-
ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই
-
বড় খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা
-
পুনঃতফসিল নীতিতে সংস্কার
-
ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়,
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। দ্রুত কার্যকর নীতি এবং কঠোর তদারকি ছাড়া এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এখনই প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত, নইলে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘদিন দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।




