CUSMA থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি
উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক কাঠামো CUSMA থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি ঘিরে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি চাইলে উত্তর আমেরিকার এই আধুনিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিতে পারেন, কিংবা পুরো চুক্তিটিই ভেঙে দিয়ে নতুন আলাদা চুক্তি করতে পারেন কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে।
এই ঘোষণার প্রভাব পড়ে সরাসরি কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন অর্থনীতির ওপর। একইসঙ্গে উত্তর আমেরিকার শিল্পখাত, বিনিয়োগ পরিবেশ, শ্রমবাজার, কৃষি এবং পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী মহল বলছে—ট্রাম্পের এই মন্তব্য হয়তো কেবল চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। অন্যদিকে কূটনীতিক মহল বলছে—এটি হয়তো বাস্তবেই চুক্তি ভেঙে ফেলার প্রস্তুতির অংশ।
নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো—CUSMA থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি নিয়ে কানাডাসহ তিন দেশের সামনে কী কী বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
CUSMA থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি: কীভাবে শুরু হলো
২০২৬ সালে CUSMA–র আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা (Review) হওয়ার কথা। তার আগেই ওয়াশিংটনে তিন দিনব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ জন-শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫০টিরও বেশি শিল্পখাত জানিয়েছে—CUSMA না থাকলে তাদের ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
তারপরও ট্রাম্প ও তার বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) একাধিকবার বলেছেন—
চুক্তি বাড়ানো হবে কি না, এ সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। এমনকি চুক্তি বাতিল করাও হতে পারে।

এই মন্তব্যই তিন দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
মার্কিন শিল্পখাত কেন CUSMA বজায় রাখতে চাপ দিচ্ছে
অটোমোটিভ, কৃষি, ভোক্তা পণ্য, প্রযুক্তি—সব সেক্টরই CUSMA–কে “জীবনরেখা” বলে আখ্যা দিয়েছে।
Consumer Brands Association–এর ভিপি থমাস মাদ্রেকি বলেন—
“CUSMA আমাদেরকে তিন দেশের বাজারে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করতে দেয়। এটি ছাড়া দাম বাড়বে, সরবরাহ ভেঙে পড়বে।”
এখন এই ব্যবসায়ী মহল বলছে—চুক্তি না থাকলে তিন দেশের বাজারই অনিশ্চয়তার দিকে যাবে।
কেন ট্রাম্প চুক্তি ভাঙার কথা তুলছেন?
এখানে দুটি মত দেখা গেছে—
১️⃣ চুক্তিকে আরও কঠোর করতে চাপ সৃষ্টি করা
বহু বিশ্লেষক মনে করেন, এটি ট্রাম্পের পরিচিত “বিগ ডিল” কৌশল।
তিনি প্রথমে বড় হুমকি দেন, যাতে অন্য দেশগুলো আরও ছাড় দিতে বাধ্য হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা বলছেন—
“CUSMA হচ্ছে ট্রাম্প আমলের সেরা বাণিজ্য চুক্তি। তিনি এটিই ধরে রাখতে চাইবেন, কিন্তু শর্ত আরও কঠোর করে।”
২️⃣ সত্যিই CUSMA ভাঙার পরিকল্পনা
আরেক পক্ষ মনে করছে—ট্রাম্প আবারও আলাদা করে দুই দেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে চান, যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আরও বেশি সুবিধাজনক হবে।
এক্ষেত্রে CUSMA–র পূর্ণ অবসান ঘটতেও পারে।
‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’? — কানাডিয়ান কূটনীতিকের সতর্কবার্তা
সাবেক কানাডিয়ান কূটনীতিক বেন রোজওয়েল দৃঢ়ভাবে বলছেন—
“আমি মনে করি এটি CUSMA–র শেষ। এটি একটি ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’। কানাডাকে প্রস্তুত হতে হবে।”
তার মতে, ট্রাম্পের অবস্থান একেবারেই অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা।
তিনি আরও বলেন—
“কানাডার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—নিজস্ব বাণিজ্য সার্বভৌমত্বের ক্ষতি।
চুক্তি ধরে রাখার জন্য সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়া যাবে না।”
কানাডার জন্য কী হতে পারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
যদি CUSMA থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি বাস্তব হয়, তাহলে—
১️⃣ অটোমোটিভ সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে
অর্ধেকের বেশি গাড়ির যন্ত্রাংশ তিন দেশের মধ্যে শুল্কমুক্তভাবে চলাচল করে।
২️⃣ কৃষি রপ্তানি ধাক্কা খাবে
কানাডার ডেইরি, মাংস ও শস্য উৎপাদকদের ওপর পড়বে বড় চাপ।
৩️⃣ হাজার হাজার চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে
বিশেষ করে—অন্টারিও, কুইবেক ও ম্যানিটোবা অঞ্চলে।
৪️⃣ রপ্তানিকারকদের ওপর নতুন ট্যারিফ আরোপ
যা সরাসরি দাম বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে।
৫️⃣ বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়বে
মার্কিন বাজারে প্রবেশ নিয়ে ঝুঁকি বাড়বে।
২০২৬ সালের Review: কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
চুক্তি বাতিল—এটাই শেষ কথা নয়।
কোনো দেশ চাইলে মাত্র ৬ মাসের নোটিশ দিয়েই CUSMA থেকে বের হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই–এর আগে—
🔹 তিন দেশকে ঘোষণা দিতে হবে—
-
তারা CUSMA চালিয়ে যেতে চায়,
-
নাকি নতুন করে আলোচনা শুরু করতে চায়।
🔹 এটি হবে ইতিহাসের প্রথম CUSMA রিভিউ
এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে—
“এটি পূর্ণাঙ্গ পুনঃআলোচনায়ও পরিণত হতে পারে।”
এ কারণে ২০২৬ সালকে বলা হচ্ছে—
“CUSMA–র ভাগ্য নির্ধারণের বছর”।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—কানাডা ও মেক্সিকো চুক্তির অপব্যবহার করছে
হিয়ারিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শিল্পখাত অভিযোগ করেছে—
-
কানাডা ও মেক্সিকোর মাধ্যমে চীনের স্টিল
-
চীনে তৈরি গাড়ির যন্ত্রাংশ
-
এবং কিচেন ক্যাবিনেট
মার্কিন বাজারে ট্যাক্স-ফ্রি প্রবেশ করছে।
এই অভিযোগগুলো ট্রাম্প প্রশাসন আরও জোরালোভাবে ব্যবহার করতে পারে CUSMA–র ওপর চাপ বাড়াতে।
বর্তমানে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক এক অস্থির পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে।
CUSMA থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি নিছক রাজনৈতিক নাটকও হতে পারে, আবার এটি চুক্তির মৌলিক রূপ বদলে দেওয়ারও সূচনা হতে পারে।
কানাডা ও মেক্সিকোর জন্য ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তি বাতিল হোক বা পুনঃআলোচনা—দুই ক্ষেত্রেই তিন দেশের অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব পড়বে।
এরই মধ্যে ব্যবসায়ী মহল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—
CUSMA ছাড়া উত্তর আমেরিকার অর্থনীতি পিছিয়ে যাবে।
এখন দেখার বিষয়—আগামী বছরগুলোয় রাজনৈতিক চাপের সামনে বাণিজ্যিক বাস্তবতা কতটা দৃঢ় থাকে।




