প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আবেদন করেছেন প্রায় ৫.৯৪ লাখ প্রবাসী। পোস্টাল ব্যালটে ভোটের পূর্ণ প্রক্রিয়া জানুন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমে বড় ধরনের সাড়া মিলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা এবার প্রথমবারের মতো আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এ উদ্যোগের আওতায় এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি প্রবাসী নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং প্রবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী ভোটাধিকার নিয়ে আলোচনা চললেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এবারই প্রথম দৃশ্যমান ফল মিলছে।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা ২০ মিনিট পর্যন্ত প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন মোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৫২৩ জন। এর মধ্যে—
-
পুরুষ ভোটার: ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮৩ জন
-
নারী ভোটার: ৩৮ হাজার ৬৩৮ জন
এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে আরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী নিবন্ধনের আওতায় আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথমবার আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নতুনত্ব হলো আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে প্রবাসী ভোটাররা ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী সংযোজন।
এই ব্যবস্থার আওতায় শুধু প্রবাসীই নয়—
-
আইনি হেফাজতে থাকা নাগরিক
-
নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও
ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে ভোটাধিকার আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ১৯ নভেম্বর। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, এই নিবন্ধন চলবে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
নিবন্ধনের জন্য প্রবাসীদের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। অ্যাপে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন হলে ভোটারদের ঠিকানায় ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে।
যেসব দেশে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন চলছে
বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে এই নিবন্ধন কার্যক্রম চালু রয়েছে। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, ব্রাজিল, মিসর, মরক্কো, কেনিয়া, তানজানিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা, লিবিয়া, মোজাম্বিক, আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ সুদানসহ আরও অনেক দেশ।
এই বিস্তৃত তালিকা প্রমাণ করে, প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমকে সত্যিকার অর্থেই বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় নির্বাচন কমিশন।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া
নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন প্রবাসী ভোটারদের ঠিকানায় ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠাবে। ভোটাররা—
-
ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন
-
নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তা পূরণ করবেন
-
ফিরতি খামের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন
এই পুরো প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য: ৫০ লাখ প্রবাসী ভোট
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী ভোটারকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা। বর্তমানে নিবন্ধনের সংখ্যা সেই লক্ষ্যের দিকে একটি শক্তিশালী সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসী ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে।
প্রবাসী ভোটাধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নেও তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এতে—
-
রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে
-
প্রবাসীদের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে
-
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পোস্টাল ভোট
বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় এই পদ্ধতি বহুদিন ধরে কার্যকর। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার সূচনা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম সেই প্রস্তুতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করবে।




