সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬ জারি করেছে সরকার। এমডি, ডিএমডি ও জিএম পদে যোগ্যতা, বয়সসীমা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানুন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬ জারি করার মাধ্যমে ব্যাংকটির শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, কাঠামোবদ্ধ ও মানসম্মত করা হয়েছে। এই নীতিমালার ফলে সরকারি ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে এমডি, ডিএমডি ও জিএম—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগ, যোগ্যতা, বয়সসীমা এবং বাছাই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হলো।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬ কী বলছে

নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬ অনুযায়ী, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালার লক্ষ্য হচ্ছে—শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলা।
এই নীতিমালার আওতায় প্রথমবারের মতো সরকারি ব্যাংকের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এমডি ও সিইও নিয়োগের শর্ত ও যোগ্যতা
ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে নিয়োগ দেওয়া হবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। জাতীয় পর্যায়ের বহুল প্রচারিত দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তিন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।
প্রার্থীর জন্য আবশ্যক যোগ্যতাগুলো হলো—
-
স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি
-
অর্থনীতি, ফাইন্যান্স, হিসাববিজ্ঞান, ব্যাংকিং, ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবসায় প্রশাসনে ডিগ্রিধারীরা অগ্রাধিকার পাবেন
-
শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরে তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য নয়
-
ব্যাংকিং খাতে ন্যূনতম ২০ বছরের অভিজ্ঞতা
-
কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত সিইও অথবা সিইও পদের ঠিক আগের পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা
এ ছাড়া প্রার্থীকে ইসলামি ব্যাংকিং, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ইসলামিক ফাইন্যান্স পণ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে।
একীভূতকরণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার গুরুত্ব
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬–এ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (Merger & Acquisition) সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে একীভূতকরণের যে ধারা দেখা যাচ্ছে, তা বিবেচনায় নিয়েই এই শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
এমডি পদের জন্য বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর।
ডিএমডি পদের জন্য অভিজ্ঞতার মানদণ্ড
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের কমপক্ষে ১৯ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি অব্যবহিত আগের পদে অন্তত দুই বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক।
ডিএমডি পদের জন্য বয়সসীমা ৪৫ থেকে ৬২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পদের ক্ষেত্রেও ইসলামি ব্যাংকিং, শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিএম পদে বদলি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) পদের ক্ষেত্রে নীতিমালায় কিছুটা ভিন্নতা রাখা হয়েছে। এখানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে কর্মরত জিএম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিলুপ্ত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, এক্সিম, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেও যোগ্যতার ভিত্তিতে জিএম নিয়োগ দেওয়া যাবে।
জিএম পদের জন্য—
-
ন্যূনতম ১৮ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা
-
সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬০ বছর
নির্ধারণ করা হয়েছে।
কঠোর নৈতিক ও আইনি শর্ত
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬–এ তিনটি পদের ক্ষেত্রেই কঠোর নৈতিক ও আইনি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী—
-
ঋণখেলাপি হলে
-
আর্থিক অনিয়মে জড়িত থাকলে
-
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে
-
প্রতারণা বা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে
তিনি নিয়োগের অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া ও বাছাই কমিটি
নীতিমালা অনুযায়ী এমডি ও ডিএমডি নিয়োগের জন্য অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। অন্যদিকে জিএম পদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের পৃথক কমিটি দায়িত্ব পালন করবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে সাতটি ধাপে। সব ধরনের যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন শেষে পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হবে।
ব্যাংকিং খাতে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালা ২০২৬ ব্যাংকটির শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পেশাদার নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে এই নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




