১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কিনবে সরকার—রমজান সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখতে নেওয়া হয়েছে স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত। জানুন ব্যয় ও দাম।
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কিনবে সরকার, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাজারে ডালের দাম নিয়ন্ত্রণ, সরকারি বাফার স্টক জোরদার এবং কৃত্রিম সংকট রোধ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির চলতি বছরের চতুর্থ সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে একাধিক খাতে সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল মসুর ডাল, ভোজ্য তেল ও সার ক্রয়।
রমজান সামনে রেখে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত
রমজান এলেই ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। সে কারণেই আগেভাগে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কিনবে সরকার—এমন সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাংবাদিকদের জানান, রমজান উপলক্ষে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ডাল ও ভোজ্য তেলের সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।
কীভাবে ও কোথা থেকে মসুর ডাল কেনা হবে

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কেবিসি অ্যাগ্রো প্রডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে মসুর ডাল সংগ্রহ করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ১০টি লটে এই ডাল কেনা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা ৯৬ পয়সা। সরকারি হিসাবে, এই দামে ডাল কেনার ফলে বাজারে হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমবে।
সরকারি বাফার স্টক ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
সরকারি বাফার স্টক বাড়ানো এই উদ্যোগের অন্যতম মূল লক্ষ্য। যখন বাজারে সংকট তৈরি হয় বা দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন এই বাফার স্টক থেকে পণ্য ছাড় দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কিনবে সরকার—এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে রমজান মাসে ডালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো উপকৃত হবে।
ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে বড় উদ্যোগ
মসুর ডালের পাশাপাশি ভোজ্য তেলের বাজারও সরকারের নজরে রয়েছে। সভায় ১ কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে মোট ব্যয় হবে ১৮৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
-
৫০ লাখ লিটার তেল সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড থেকে প্রতি লিটার ১৮৫ টাকা ৯৫ পয়সা দরে
-
বাকি ৫০ লাখ লিটার শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে প্রতি লিটার ১৮৫ টাকা ৯০ পয়সা দরে কেনা হবে
এই উদ্যোগের লক্ষ্যও একটাই—রমজানে ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতা ঠেকানো।
কৃষি উৎপাদন ধরে রাখতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত
কেবল ভোক্তা বাজার নয়, কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ইউরিয়া ও এমওপি সার আমদানির দুটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফার্টিগ্লোব ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানি করা হবে। এতে ব্যয় হবে ২০১ কোটি ২২ লাখ টাকা, যেখানে প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছে ৪১০ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া রাশিয়ার জেএসসি প্রডিন্টর্গ থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আমদানি করা হবে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এই সার আমদানি করবে। এতে মোট ব্যয় হবে ১৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব সার আমদানির ফলে আসন্ন চাষ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
ব্লু ইকোনমি ও গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন
সরকারের ব্লু ইকোনমি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাবও সভায় অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জন্য নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি ছোট গবেষণা জাহাজ ও দুটি স্পিড বোট কেনা হবে।
এই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৬১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড এসব জাহাজ ও বোট সরবরাহ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণায় নতুন গতি আনবে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নে সড়ক প্রকল্প
সভায় লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী জেলা হয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের সুপারিশ করা হয়।
এই সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং শিল্প বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বাজার ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
সার্বিকভাবে, ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কিনবে সরকার—এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে যে উদ্বেগ থাকে, তা কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি সরকারি ক্রয় ও বাজার মনিটরিং কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এই উদ্যোগ বাস্তব সুফল দেবে।




