নির্বাচনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে মাঠে নামছে ৬৫৫ বিচারক—জানুন বিস্তারিত।
নির্বাচনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ–এর মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সারা দেশে ৬৫৫ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। ভোটের আগে ও পরে মোট পাঁচ দিন তাঁরা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্বাচনী অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচার পরিচালনা করবেন।
এই তথ্য জানানো হয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (আইন) মোহাম্মদ দিদার হোসাইনের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের ঘটনা সশরীরে আমলে নিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এই নিয়োগ।
৬৫৫ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট: দায়িত্ব ও সময়সীমা

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করবেন। এই সময়সীমার মধ্যে রয়েছে—
-
ভোটগ্রহণের আগের দুই দিন
-
ভোটগ্রহণের দিন
-
ভোটগ্রহণের পরের দুই দিন
এই পাঁচ দিন তাঁরা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নির্বাচনী অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনে আইনি ভিত্তি
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অফ দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২’ (পি.ও. নং ১৫৫ অব ১৯৭২)–এর অনুচ্ছেদ ৮৯ (এ) অনুযায়ী এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন ও বিচার বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।
এই আইনি ক্ষমতার আওতায় তাঁরা নির্বাচনী অপরাধসমূহের বিচার পরিচালনা করবেন।
কোন কোন অপরাধে তাৎক্ষণিক বিচার
নির্বাচনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনী অপরাধ দ্রুত দমন ও বিচার নিশ্চিত করা। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাঁরা মূলত নিচের অপরাধগুলো আমলে নেবেন—
-
ভোটদানে বাধা প্রদান
-
ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা
-
নির্বাচনী পরিবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
-
অন্যান্য তফসিলভুক্ত নির্বাচনী অপরাধ
এই অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে ‘দ্য কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮’–এর ১৯০ (১) ধারা অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বা সামারি ট্রায়াল পরিচালনা করা হবে।
প্রজ্ঞাপনে দেওয়া সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য একগুচ্ছ স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যোগদান সংক্রান্ত নির্দেশ
নিয়োগপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার পূর্বাহ্নে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় যোগদান করতে বলা হয়েছে। যোগদানপত্রের একটি কপি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো বাধ্যতামূলক।
বিচার কার্যক্রম ও রিপোর্টিং
দায়িত্ব পালনকালে কোনো নির্বাচনী অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করা হলে তা দ্রুত সামারি ট্রায়াল পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করতে হবে।
বিচারের ফলাফল বা নিষ্পত্তির বিবরণী (ডিসপোজাল স্টেটমেন্ট) অবশ্যই ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইসি সচিবালয়ের আইন শাখায় নির্ধারিত ছকে পাঠাতে হবে।
সহায়ক জনবল ও প্রশাসনিক সহায়তা
বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে প্রতিটি ম্যাজিস্ট্রেট একজন করে বেঞ্চ সহকারী, স্টেনোগ্রাফার অথবা অফিস সহকারী সঙ্গে রাখতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট জেলার বিচারকদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যানবাহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজন অনুযায়ী জিপ, মাইক্রোবাস কিংবা স্পিডবোটসহ যানবাহনের ব্যবস্থা করবেন।
এ ছাড়া বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার অথবা স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩০০ আসনে সুনির্দিষ্ট অধিক্ষেত্র বণ্টন
তফসিল অনুযায়ী, সারা দেশের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার জন্য এই ৬৫৫ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে সুনির্দিষ্ট অধিক্ষেত্র ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চগড়-১ আসন থেকে শুরু করে বান্দরবান পর্যন্ত প্রতিটি সংসদীয় আসনে এক বা একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতিটি আসনে এই ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাচনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন।
নির্বাচন পরিচালনায় বিচার বিভাগের ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে নির্বাচনী অপরাধের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে এবং ভোটারদের আস্থা বাড়বে।
নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ ভোটগ্রহণের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




