চীনের সঙ্গে আরো গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ, আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৮০ দিনের সংস্কার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন।
বেইজিং: চীনের সঙ্গে আরও গভীর বাংলাদেশ-চীন শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে তাদের ভ্যালুচেইন সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করতে চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলার ঘোষণাও দিয়েছেন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চীনা ব্যবসায়ীদের সামনে বিশেষ উপস্থাপনা করেন।
অনুষ্ঠানে চীনের ১২৫ জন ব্যবসায়ী অংশ নেন এবং বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশ-চীন শিল্প অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন,

বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত। তিনি চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানোর আহ্বান জানান।
তার মতে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে শিল্প সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে আরও গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী এবং এই সহযোগিতা উভয় দেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিনিয়োগ সহজ করতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার একটি ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
এই পরিকল্পনার আওতায়—
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো হবে।
- সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন জোরদার করা হবে।
- নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হবে।
- বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক পুঁজি সংক্রান্ত কার্যপ্রণালি আধুনিকায়নের অংশ হিসেবেই এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নতুন ব্যবসার লাইসেন্স মিলবে ১৫ দিনের মধ্যে
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন থেকে নতুন ব্যবসার লাইসেন্স অনুমোদনের সময়সীমা মাত্র ১৫ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ পদক্ষেপ বিদেশি ও দেশীয় উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করা সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয়
সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালু করা হবে।
এই কার্যালয়ের মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে সরাসরি তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়াও সহজতর হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সরকারের মতে, এ উদ্যোগ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে চীনা সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে।
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকার আশা করছে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে উপস্থাপিত তথ্য ও সরকারি পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট যে, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিল্প ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ হলে উৎপাদন, রপ্তানি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্মেলনে আলোচিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের ঘোষিত সংস্কার কার্যক্রম কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের এই বিনিয়োগ ফোরাম দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





