এইমাত্র

আরও খবর

News Photocard (12)
আমাকে আটক বা গ্রেপ্তার নয়, বরং ‘অপহরণ’ করা হয়েছে: ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি
News Photocard (6)
হুতিদের বিরুদ্ধে এবার যুদ্ধে জড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
News Photocard (3)
যুক্তরাষ্ট্রে নিহত ৪, বিদ্যুৎহীন সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি মানুষ
News Photocard (23)
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন
News Photocard (14)
ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ : স্কুলগুলোর অবস্থা কতটা জরাজীর্ণ

মোদির বলা ‘দিমাগি নকশাল’ নিয়ে ভারতে কেন এত আলোচনা

মোদির বলা ‘দিমাগি নকশাল’ নিয়ে ভারতে কেন এত আলোচনা, স্বাধীনতা দিবসে নরেন্দ্র মোদির মন্তব্য, বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া ও কিরেন রিজিজুর ব্যাখ্যায় কেন বাড়ল আলোচনা—জানুন।

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণের একটি অংশকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র দিমাগি নকশাল বিতর্ক। মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাফল্যের কথা বলার পাশাপাশি মোদি দাবি করেন, ‘মতাদর্শগত নকশালবাদ’ এখনও ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ। তাঁর বক্তব্যে ‘দিমাগি নকশাল’দের চিহ্নিত করে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করার কথাও উঠে আসে। এরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া।

লালকেল্লার ভাষণে মোদির মূল বক্তব্য

জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নরেন্দ্র মোদি ভারতের একসময়কার মাওবাদী সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় একসময় বন্দুকের মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল।

মোদি বলেন, ২০১৪ সাল থেকে সরকার ‘নকশালমুক্ত ভারত’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে। ধারাবাহিক নিরাপত্তা অভিযান ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে সেই প্রচেষ্টা সাফল্যের দিকে এগিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও বলা হয়, যেসব এলাকায় আগে নকশালদের বন্দুকের শব্দ শোনা যেত, সেসব জায়গায় এখন উন্নয়ন, আস্থা ও সরকারি উদ্যোগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তবে তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সশস্ত্র নকশালবাদের পাশাপাশি মতাদর্শগত প্রভাবের বিষয়টি সামনে আনা।

দিমাগি নকশাল বিতর্কের মূল কারণ কী?

মোদির বক্তব্য অনুযায়ী, জঙ্গলে অস্ত্র হাতে থাকা নকশালদের বড় একটি অংশকে নিষ্ক্রিয় করা গেলেও ‘দিমাগি নকশাল’রা এখনও সক্রিয়। তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের মানুষ নানা কৌশলে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং সুযোগ পেলে সহিংসতার পথ খুঁজতে পারে।

এই কারণেই তিনি এমন মানসিকতার মানুষদের চিহ্নিত করে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এখানেই দিমাগি নকশাল বিতর্ক রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। কারণ, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হচ্ছে—এ নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। সরকারের সমালোচকদের নিশানা করতেই এই নতুন রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়।

নকশাল ও মাওবাদী আন্দোলনের পটভূমি

ভারতের নকশাল ও মাওবাদী আন্দোলন মূলত চরম বামপন্থী সশস্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে কৃষক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

এই আন্দোলনের সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক মাও সে-তুংয়ের সাম্যবাদী এবং সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণার সম্পর্ক রয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল ছিল আন্দোলনটির অন্যতম লক্ষ্য। ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জঙ্গল এবং অনুন্নত আদিবাসী এলাকায়, বিশেষ করে ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডে, দীর্ঘদিন মাওবাদীদের প্রভাব ছিল।

এসব এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মাওবাদীদের সংঘর্ষও হয়েছে।

মোদির বক্তব্যে মতাদর্শগত প্রভাবের অভিযোগ

মোদির ভাষণে শুধু সশস্ত্র মাওবাদীদের প্রসঙ্গই ছিল না। তিনি নকশাল মতাদর্শের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের অভিযোগও তোলেন।

প্রধানমন্ত্রীর দাবি, অতীতে মাওবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। নীতিনির্ধারণ এবং বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগেও সেই মতাদর্শের প্রভাব ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ফলে মোদির বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, নকশালবাদের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াইকে শুধু সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে মতাদর্শগত প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিই দিমাগি নকশাল বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করেছে।

বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া ও চিদাম্বরমের কটাক্ষ

‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, সরকার সমালোচকদের নিশানা করতেই এই তকমা ব্যবহার করেছে।

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম এ নিয়ে পাল্টা কটাক্ষ করেন। তিনি নিজেকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে গর্বিত বলে মন্তব্য করেন।

চিদাম্বরমের এই প্রতিক্রিয়ার পর বিতর্কটি আরও রাজনৈতিক মাত্রা পায়। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধ নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা রাজনৈতিক বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

কিরেন রিজিজুর ব্যাখ্যা কী?

বিতর্কের মধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝানো হয়নি।

রিজিজুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যারা মাওবাদীদের সমর্থন করে, সংবিধানকে অস্বীকার করে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ায়, ৩৭০ ধারার পক্ষে অবস্থান নেয় অথবা ‘চিকেনস নেক’ তথা শিলিগুড়ি করিডর বিচ্ছিন্ন করার কথা বলে—তাদের এই শ্রেণির মধ্যে ধরা হচ্ছে।

এই ব্যাখ্যার ফলে দিমাগি নকশাল বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়। প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত শব্দটির রাজনৈতিক অর্থ কী এবং কাদের উদ্দেশে তা বলা হয়েছে—সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন রিজিজু।

গত এক দশকে নকশালবিরোধী অভিযান

উৎস তথ্য অনুযায়ী, নকশাল আন্দোলনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিযান গত এক দশকে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে একাধিক মাওবাদী নেতা নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে বহু সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন বা গ্রেপ্তার হয়েছেন।

সরকারের দাবি, একসময় মাওবাদী প্রভাবিত বহু অঞ্চলে এখন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

মোদির স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে এই সাফল্যের দাবিই গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সেই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র আন্দোলনের বাইরে মতাদর্শগত প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এনেছেন।

তরুণ প্রজন্ম ও ২০৪৭ সালের লক্ষ্য

নকশালবাদ মোকাবিলার প্রসঙ্গকে প্রধানমন্ত্রী দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।

তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, যুবসমাজকে হিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দূরে রেখে উন্নত ভারত গড়ার মূল স্রোতে যুক্ত করতে হবে। ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্য পূরণে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

অর্থাৎ, নকশালবাদ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান শুধু অতীতের সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি মোদি। তিনি এটিকে সামাজিক স্থিতিশীলতা, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।

কেন ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?

এতদিন নকশালবাদ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মূলত সশস্ত্র মাওবাদী সংগঠন, তাদের ঘাঁটি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান। কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মোদির বক্তব্যে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মতাদর্শ, প্রতিষ্ঠান এবং জনপরিসরে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন।

ফলে দিমাগি নকশাল বিতর্ক শুধু একটি রাজনৈতিক শব্দবন্ধের বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ভারতের নকশালবিরোধী নীতির পরিধি কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

অন্যদিকে বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া এবং কিরেন রিজিজুর ব্যাখ্যা দেখিয়েছে, শব্দটির রাজনৈতিক অর্থ নিয়েও মতভেদ রয়েছে।

দিমাগি নকশাল বিতর্ক নিয়ে শেষ কথা

নরেন্দ্র মোদির স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে নকশালবাদ প্রসঙ্গ এবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। সশস্ত্র মাওবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান ও সাফল্যের দাবি করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মতাদর্শগত প্রভাবের কথাও বলেছেন।

‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের একাংশ এটিকে সমালোচকদের নিশানা করার রাজনৈতিক তকমা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে কিরেন রিজিজু বলেছেন, এর মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝানো হয়নি এবং নির্দিষ্ট কিছু মতাদর্শগত অবস্থানকে লক্ষ্য করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, দিমাগি নকশাল বিতর্ক ভারতের নকশালবাদ নিয়ে পুরোনো নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক আলোচনাকে মতাদর্শ ও রাজনৈতিক পরিসরের নতুন বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

সর্বাধিক পঠিত