দ্বিগুণের বেশি বাড়ছে সরকারি বেতন, কত বছরে বাস্তবায়ন, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে বাস্তবায়ন হবে, ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালে। প্রায় ২৪ লাখ কর্মী উপকৃত হবেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের সরকারি বেতন নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। তবে পুরো বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর না করে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করবে সরকার।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় পে স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. নাসিমুল গনি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
সরকারি বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যেভাবে কার্যকর হবে

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছর—এই দুই অর্থবছরে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকার বলছে, নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনা করেই একযোগে পুরো স্কেল বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এতে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও আর্থিক সুবিধা বাড়বে, অন্যদিকে সরকারের ওপর একবারে বড় ধরনের ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে না।
সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনে বড় পরিবর্তন
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী মূল বেতনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বর্তমান কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন কাঠামোতে তা বেড়ে হবে ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ মূল বেতনের ক্ষেত্রেও দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
তবে এসব পরিবর্তন কর্মীদের হাতে একসঙ্গে পৌঁছাবে না। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কার্যকর করা হবে।
কম আয়ের কর্মীদের দেওয়া হবে অগ্রাধিকার
নতুন সরকারি বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কম আয়ের কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থাৎ নতুন কাঠামোর মূল বেতন কার্যকর করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ করা হবে। এর ফলে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে আগে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ভাতা কবে থেকে কার্যকর হবে?
মূল বেতন ধাপে ধাপে বাড়লেও বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রে আলাদা সময়সূচি রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভাতাসমূহ ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
অর্থাৎ মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন শুরু হলেও ভাতার নতুন কাঠামো কার্যকর হবে ২০২৮ সালের শুরুতে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ধাপভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধির ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও নতুন নির্দেশাবলি
মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।
এই নির্দেশাবলি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার সুপারিশ তৈরির জন্য একটি সচিব কমিটি গঠন করেছিল। সেই সচিব কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদনও মন্ত্রিসভার বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়।
সরকারি নথিপত্র ও কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটেও জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর বিষয়ে সরকারি নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামো আলাদা
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে।
সোর্স অনুযায়ী, জুডিশিয়াল সার্ভিসের নতুন বেতন স্কেলও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর মতো ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে।
এ ক্ষেত্রে পৃথক কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রায় ২৪ লাখ কর্মী ও সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত উপকৃত হবেন
নতুন সরকারি বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে বড় সংখ্যক মানুষ সরাসরি আর্থিক সুবিধার আওতায় আসবেন।
সরকারের হিসাবে, প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এর আওতায় থাকবেন।
অর্থাৎ নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব শুধু বর্তমান সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পেনশনভোগী ও যোগ্য সুবিধাভোগীরাও এর সুবিধা পাবেন।
সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় কত?
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় তৈরি হবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এই ব্যয়ের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পেনশন এবং অন্যান্য সুবিধার অতিরিক্ত ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, এই অর্থের সংস্থান মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে।
ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান ধাপে ধাপে বাজেটের মাধ্যমে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কেন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন?
নতুন সরকারি বেতন কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে বড় আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এই কারণে সরকার ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের বিবেচনায়, এভাবে ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হলে কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগের দায়িত্ব
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর করার জন্য অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে।
এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ধরনের ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত বিধান থাকবে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থাকে অনুমোদিত বেতন স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে।
ফলে নতুন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য পৃথক নির্দেশনা ও প্রক্রিয়া নির্ধারিত থাকবে।
নতুন বেতন কাঠামোর প্রত্যাশিত প্রভাব
সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কর্মোদ্যম বৃদ্ধির মাধ্যমে দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতেও এটি সহায়ক হবে বলে সরকার মনে করছে।
অন্যদিকে, নতুন কাঠামোর কারণে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হওয়ায় বাজেট ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব থাকবে।
তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মচারীদের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের তাৎক্ষণিক ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরকারি বেতন বৃদ্ধির সময়সূচি এক নজরে
নতুন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সময়সূচিগুলো হলো—
- ১ জুলাই ২০২৬: জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়ন শুরু।
- ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭: মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন।
- ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছর: পুরো বেতন কাঠামো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সময়কাল।
- ১ জানুয়ারি ২০২৮: বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর।
- পেনশন: ধাপভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর।
- সশস্ত্র বাহিনী: যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি ২০২৬, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর।
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে পুরো কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর হবে না। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে এবং ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে ভাতাসমূহ একযোগে কার্যকর হবে।
প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীর জন্য এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বার্ষিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার আর্থিক ব্যয় সরকারের জন্য বড় দায়িত্ব তৈরি করবে। ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার এই আর্থিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে।





