রূপপুরের বিদ্যুৎ আসবে নভেম্বরে, জাতীয় গ্রিডে আসতে পারে। প্রথম ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মাসের পর মাস সময় পেছানোর পর অবশেষে আগামী নভেম্বর মাসে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে প্রথম পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। তবে উৎপাদন শুরুর আগে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালব (পিওআরভি) পরীক্ষার ত্রুটি সারানোর কাজ চলছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রটি চালু হলে তৈরি হওয়া ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক জ্বালানি ক্লাবে প্রবেশ করবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন কোন ধাপ চলছে

বর্তমানে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদনে নেওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারিগরি কাজ চলছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালব বা পিওআরভি-সংক্রান্ত পরীক্ষা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষায় গত প্রায় দেড় মাস ধরে সফলতা পাওয়া যায়নি। পিওআরভি পরীক্ষায় সফলতা পাওয়ার পর ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই ধাপের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পিওআরভি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও পরবর্তী পরীক্ষায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ফলে নভেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কাজ এগোলেও শেষ মুহূর্তে সময়সূচিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
কীভাবে রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বি-ওয়ান ধাপ থেকে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ করে বি-টু ধাপে যাওয়া হয়। বি-টু ধাপকে কেউ কেউ ফিজিক্যাল স্টার্টআপ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
সহজভাবে বলা যায়, এই ধাপে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং ও ফিজিক্যাল স্টার্টআপ শেষ হওয়ার পর ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এই রিয়্যাকশনের মাধ্যমে এনার্জি বা তাপশক্তি তৈরির কথা বলা হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে ওই তাপশক্তিকে স্টিমে রূপান্তর করা হবে। সেই স্টিমের মাধ্যমে টারবাইন ঘোরানো হবে। আর টারবাইন ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
নভেম্বরেই উৎপাদনের লক্ষ্য, তবে রয়েছে অনিশ্চয়তা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট জানিয়েছেন, আইডিয়াল প্রোগ্রাম অনুসরণ করা গেলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে বি-টু ধাপে প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর টারবাইনের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ স্টিম তৈরির ধাপে আরও প্রায় ছয় সপ্তাহ প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়ায় প্রায় নয় সপ্তাহ বা দুই মাস সময় লাগার কথা। সে হিসাবে নির্ধারিত কর্মসূচি ঠিকভাবে এগোলে নভেম্বর মাসে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
তবে প্রকল্প পরিচালকও জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দিলে উৎপাদনে যাওয়ার সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। ফলে নভেম্বরের লক্ষ্য থাকলেও পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে পরবর্তী কারিগরি পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ করার ওপর।
প্রতি ইউনিট রূপপুরের বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে হতে পারে
রূপপুরের বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নিয়েও আলোচনা চলছে। ২০১৬ সালে প্রকল্পটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছিল ৪ টাকা ৬৫ পয়সা।
পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির সঙ্গে রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। এ বিষয়ে পিডিবি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য চেয়েছে।
এসব তথ্যের বিষয়ে সমাধান হলে পিডিবি ও রূপপুর কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের দাম চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগোবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, শুধু উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ হবে না। এর সঙ্গে অপারেশনাল কস্ট ও ইন্স্যুরেন্সের ব্যয়ও যুক্ত হবে।
তবে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন জানিয়েছেন, প্রতি ইউনিট রূপপুরের বিদ্যুতের দাম দুই অঙ্কে যাবে না বলে তারা মনে করছেন। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকার নিচে থাকতে পারে।
স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনায় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা। প্রকল্পের জন্য রাশিয়া থেকে যে পারমাণবিক জ্বালানি আনা হয়েছে, ব্যবহারের পর সেটিই স্পেন্ট ফুয়েলে পরিণত হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহৃত এই জ্বালানি রিয়্যাক্টরে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। এমনকি ১০ বছর পরও এটি রিয়্যাক্টরে সংরক্ষণ করা যাবে এবং সে কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরকার-টু-সরকার চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশে রূপপুরের জন্য আনা ফুয়েল ব্যবহারের পর তা ব্যবস্থাপনার জন্য রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি চুক্তিতে রয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থাপনার জন্য রাশিয়াকে কত অর্থ দিতে হবে, সে বিষয়ে বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যেহেতু ব্যবহৃত জ্বালানি রিয়্যাক্টরে দীর্ঘ সময় রাখা সম্ভব, তাই বিষয়টি নিয়ে এখনই তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারি বর্জ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
স্পেন্ট ফুয়েলের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর তৈরি হতে পারে এমন অন্যান্য ভারি বর্জ্যের ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, স্পেন্ট ফুয়েলের তুলনায় এই মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার পর প্রতিদিন তৈরি হতে থাকা বিপুল পরিমাণ ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়।
তিনি জানিয়েছেন, এসব বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সংরক্ষণাগার তৈরি হয়নি। তাই কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার আগেই বা উৎপাদন শুরুর পর দ্রুত এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞের এই বক্তব্য রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে।
রূপপুর প্রকল্পে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী
বর্তমান পরিস্থিতিতে রূপপুর প্রকল্পের সামনে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নির্ধারিত কারিগরি পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ করে উৎপাদনে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন শুরুর পর তৈরি হওয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, আইডিয়াল প্রোগ্রাম ঠিকভাবে অনুসরণ করা গেলে নভেম্বরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। তবে কোনো পরীক্ষায় নতুন করে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পিডিবির চাওয়া তথ্যের বিষয়ে সমাধান হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী নভেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকার নিচে থাকতে পারে। তবে দাম চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। একই সঙ্গে স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তিও চূড়ান্ত হয়নি।
এর পাশাপাশি কেন্দ্র চালুর পর প্রতিদিন তৈরি হতে পারে এমন ভারি বর্জ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য এখনো কোনো সংরক্ষণাগার তৈরি না হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যের পাশাপাশি নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও প্রকল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।





