চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা গুটিয়ে নেব, ডিসিসিআই চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ ও রাজস্ব সংস্কারে বড় দাবি তুলেছে ব্যবসায়ীরা।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশে ব্যবসা পরিচালনার প্রধান বাধা হিসেবে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে দায়ী করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেছেন, ডিসিসিআই চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে পারেন। রাজধানীর মতিঝিলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নবগঠিত সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, রাজস্ব সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রোববার মতিঝিলে ঢাকা চেম্বারের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নবগঠিত সরকারের নিকট ডিসিসিআই-এর প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়িক পরিবেশের নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়।
বর্তমান অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ ও ব্যবসায়িক উদ্বেগ

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের পতনের পর চাঁদাবাজির পরিমাণ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
তার ভাষায়, ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হচ্ছে। পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও আয়কর দপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দিতে বাধ্য হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ডিসিসিআই চাঁদাবাজি দমনে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানায়।
ডিসিসিআই চাঁদাবাজি দমন ও চার অগ্রাধিকার
সংবাদ সম্মেলনে চারটি অগ্রাধিকার খাত তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
১. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন
২. চাঁদাবাজি দমন
৩. সরকারি খাতে স্বচ্ছতা
৪. বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক নীতি
ডিসিসিআই জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে চাঁদাবাজদের শনাক্ত করতে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে ব্যবসায়ী সমাজ। সংগঠনটির মতে, ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোবে না।
দুর্নীতি বন্ধে জোরালো আহ্বান
সরকারি খাতে দুর্নীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাসকিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতি কমেনি। সরকারি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও অস্বচ্ছতা ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতায় ভুগছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি কমাতে ডিজিটালাইজেশন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজস্ব কাঠামো ও এনবিআর সংস্কারের দাবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাসকিন আহমেদ বলেন, এনবিআরকে পৃথকীকরণ এবং দ্রুত অটোমেশন জরুরি। কার্যকর উদ্যোগ নিলে আট মাসের মধ্যেই অটোমেশন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
কর কাঠামো সহজ করতে টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি। ব্যবসায়ীদের মতে, জটিল কর কাঠামো ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা।
ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগ জটিলতা
ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও দীর্ঘসূত্রিতা ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা বলে উল্লেখ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, ঋণ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
এছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এর ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।
ডিসিসিআই মনে করে, বিনিয়োগ সহজ হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চাঁদাবাজির প্রবণতাও কমবে।
শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানে উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে দেশের শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ বেকার রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ডিসিসিআই। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত না হলে প্রায় ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি কমে যেত।
যা মোট রপ্তানির প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। ব্যবসায়ী সংগঠনটি মনে করে, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অর্থনীতি পিছিয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি নিয়ে আপত্তি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, চুক্তিটি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
তিনি বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এই চুক্তি করা হয়েছিল। আদালতের রায়ের পর তা অবৈধ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে কৌশলগত দরকষাকষি প্রয়োজন যাতে উভয় দেশের জন্য ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় এর মতো বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে।
ঋণখেলাপি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
সংবাদ সম্মেলনে ইচ্ছাকৃত নয় এমন ঋণখেলাপিদের পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
ডিসিসিআই মনে করে, আর্থিক খাত শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ প্রবাহ ব্যাহত হবে।
সরকারের প্রতি বার্তা
প্রশ্নোত্তর পর্বে তাসকিন আহমেদ বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনে তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ী সমাজ অভিযোগ করছে না, বরং সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো চুক্তি হয়ে থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসিসিআই চাঁদাবাজি দমন, স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কার না হলে ব্যবসা পরিবেশের উন্নতি কঠিন হবে।




