ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে তরুণ নেতৃত্ব, ঐক্য, গণভোট ও সংস্কার নিয়ে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। বিস্তারিত পড়ুন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, তিনি তরুণদের হাত ধরেই একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চান। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি রাজনৈতিক সংস্কার, গণভোট, অর্থনীতি, নারীর অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল কেন এই পরিবর্তন প্রয়োজন এবং কোন পথ ধরে দেশকে এগিয়ে নিতে চান।
ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে তরুণ সমাজকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
তরুণদের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান

ভাষণের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা তরুণদের সঙ্গে যুক্ত হতে চান, কারণ তরুণরাই প্রযুক্তি বোঝে এবং সামনে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তার ভাষায়, এই প্রজন্মই পারবে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
তিনি বলেন, তরুণদের হাতে নতুন দেশ তুলে দেওয়াই তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে স্পষ্ট করেন, পরিবর্তনের জন্য নতুন নেতৃত্ব ও নতুন চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
জুলাইয়ের চেতনা ও ঐক্যের রাজনীতির কথা
জামায়াত আমির বলেন, জুলাইয়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের কথা বলেন এবং বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দেশকে মুক্ত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তার মতে, রাষ্ট্রে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে হবে। তিনি এমন রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেন যেখানে পারিবারিক পরিচয়ের কারণে কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতায় বসতে পারবে না।
রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা এমন বাংলাদেশ চান যেখানে রাষ্ট্র সবার হবে এবং সরকার পরিচালিত হবে জনগণের ইচ্ছায়। ক্ষমতা কোনো গোষ্ঠী বা পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না—এমন রাষ্ট্র কাঠামোর কথা তিনি তুলে ধরেন।
ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
গণভোট ও সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অবস্থান
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ নিরাপত্তা, সুশাসন ও ইনসাফ চায়। এই মূল্যবোধের ভিত্তিতেই বাংলাদেশকে সাজাতে চান তারা। তিনি জানান, রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে সরকার আগেও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল, তবে তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লে এই সংস্কার প্রক্রিয়া পূর্ণতা পাবে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
সাহসী তরুণদের উদাহরণ ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস সবার থাকে না। তবে আবরার ফাহাদ, আবু সাইদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদি এবং তাদের সহযোদ্ধারা এই সাহস দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, এই দেশ সময়ের সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে চান এবং তারাই ভবিষ্যতে দেশের পথনির্দেশ করবে।
দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠনের অভিযোগ
ভাষণে জামায়াত আমির শাসক শ্রেণির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক শাসক নিজেদের দেশের মালিক মনে করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রতিষ্ঠান ও নীতিকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, চুরি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পকে লুণ্ঠনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি দাবি করেন, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিরা সংসদ, সরকার ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করলেও কেউ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হননি।
নারীর মর্যাদা ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। ক্ষমতায় এলে নারীরা শুধু ঘরের ভেতর নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বেও থাকবে—এমন প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
করপোরেট জগৎ থেকে রাজনীতি পর্যন্ত সবখানে নারীদের মেধার মূল্যায়ন হবে বৈষম্য ছাড়া—এই অঙ্গীকারও তিনি করেন। ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না।
মানবাধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সহাবস্থান
তিনি বলেন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য সবার মর্যাদা ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সবার জন্য এই দেশ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কেউ আঘাত করার চেষ্টা করলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করা হবে।
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের প্রয়োজন
ভাষণের শেষাংশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার দরকার।
বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টর এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে সংস্কারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, এই সংস্কার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বার্তার গুরুত্ব
ডা. শফিকুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণটি মূলত একটি নীতিগত ও আদর্শিক অবস্থান তুলে ধরে। এতে তরুণ নেতৃত্ব, সংস্কার, গণভোট, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
এই বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




