এক বিশ্বাসঘাতকের জবানবন্দি,মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিয়া পরিবার নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। একাধিক পরিকল্পনা ও রিমান্ডে স্বীকারোক্তি প্রকাশ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত এক-এগারো সময়কাল নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর রিমান্ডে দেওয়া জবানবন্দির মাধ্যমে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিএনপি ও জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে পরিকল্পিত ভূমিকা রাখার কথা স্বীকার করেছেন বলে তদন্ত সূত্রে জানা গেছে। এই পুরো প্রেক্ষাপট ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে এক-এগারো ষড়যন্ত্র মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
জিয়া পরিবারকে টার্গেট করার অভিযোগ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, এক-এগারো সময়কালে বিএনপি এবং জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে “মাইনাস” করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আত্মীয় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সেনাপ্রধান না হওয়ায় ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই তিনি এ অবস্থানে যান।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের একটি পরিকল্পনাও তারই নেতৃত্বে হয়েছিল, যাতে বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিকভাবে আপস করতে বাধ্য হন।
এক-এগারো ষড়যন্ত্র মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও পরিকল্পনার অভিযোগ
তদন্তে উঠে এসেছে, পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চাপের মধ্যে এনে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া।

মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন, বেগম খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে রাজি হননি এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে গ্রেপ্তারের পরও জিয়া পরিবার রাজনৈতিকভাবে অনড় থাকে।
এ কারণে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
ক্ষমতার কেন্দ্র ও সেনাপ্রধান হওয়ার পরিকল্পনা
রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যে মাসুদ উদ্দিন আরও জানান, এক-এগারোর পর সেনাপ্রধান পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি নিজে সেনাপ্রধান হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
তার ভাষ্যমতে, মইন উ আহমেদ পদত্যাগ করলে তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে আসবেন—এমন ধারণা ছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।
সম্পদ ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে অবসরের পর তিনি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন।
তার সম্পদের অবস্থান রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে—এমন তথ্য তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারসহ একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও তদন্তের অগ্রগতি
গত ২৩ মার্চ বারিধারা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর একাধিক মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এরপর রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা চলমান তদন্তে সহায়তা করছে।
এক-এগারো প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ভূমিকা
বিশেষজ্ঞ ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এক-এগারো সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক ব্যক্তিদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন অন্যতম।
তৎকালীন সময়ে তিনি নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির সময় তার উপস্থিতি এবং ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
বিতর্কিত “মাইনাস টু ফর্মুলা”
এক-এগারোর সময় আলোচিত “মাইনাস টু ফর্মুলা” অনুযায়ী দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চাপের মধ্যে আনার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
এ প্রসঙ্গে উঠে এসেছে এক-এগারো ষড়যন্ত্র মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এর ভূমিকার বিষয়টি।
আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক অগ্রগতি
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং রিমান্ডে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে আদালত ও তদন্ত সংস্থাগুলো বলছে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।




