ভুয়া স্পন্সরে ইতালিতে ‘শ্রমদাস’ বানানোর ফাঁদে পড়ে রাসেল হারান ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা। সিআইডি চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে, তবে বিচার শুরু হয়নি।
ইতালিতে বৈধ চাকরি, স্পন্সর ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে ভোলার লালমোহনের মো. রাসেলের কাছ থেকে ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইতালিতে যাওয়ার পর রাসেলকে একটি কক্ষে আটকে রেখে অন্যের কাছে ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করা হয়। পরে ইতালি পুলিশের সহায়তায় তিনি জানতে পারেন, তাঁকে যে স্পন্সরের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
এই ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মানবপাচার ও অভিবাসন ট্রাইব্যুনালে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রাসেল। আদালতের নির্দেশে তদন্ত করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। তবে তদন্তে সত্যতা মিললেও আসামিদের কেউ এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারও শুরু হয়নি।
কীভাবে শুরু হয় ভুয়া স্পন্সরে ইতালি যাওয়ার প্রতারণা

মামলার অভিযোগ ও সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার নয়াপল্টনে রাসেলের চাচার অফিসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলীর। ইতালিতে বৈধভাবে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে হাসান তাঁকে প্রলুব্ধ করেন।
২০২৩ সালের ২০ মার্চ নয়াপল্টনের একটি অফিসে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে রাসেল ও হাসান আলীর মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ লাখ টাকা দিলে বৈধ ইতালিয়ান স্পন্সর ভিসা, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট কার্ড বা পিআরসি এবং চাকরি দেওয়ার কথা ছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে প্রসেসিং, ভিসা ফি, ম্যানপাওয়ার ও বিমান টিকিটের খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে রাসেলের কাছ থেকে মোট ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতালিতে গিয়ে আটকে পড়েন রাসেল
২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ইতালি পৌঁছান রাসেল। হাসান আলীর নির্দেশ অনুযায়ী তিনি তাঁর বেয়াই মো. সাঈদের কাছে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাঈদ তাঁকে ইতালির নেপোলির পালমা ক্যাম্পানিয়ায় একটি কক্ষে নিয়ে প্রায় এক মাস আটকে রাখেন। তাঁকে বৈধ কোনো কাজ না দিয়ে অন্য এক ব্যক্তির কাছে জোরপূর্বক ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির জন্য দেনদরবার শুরু করা হয়।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রাসেল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি সাঈদের কাছে বৈধভাবে কাজ দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং তাঁকে অন্য কারও কাছে তুলে না দেওয়ার আকুতি জানান। একপর্যায়ে গোপনে দেশে মামাকে বিষয়টি জানালে তাঁর মামা পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
এ সময় রাসেলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাঈদ বৈধ স্পন্সরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য আরও চার লাখ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়বার ইতালি গিয়েও মুক্তি মেলেনি
অতিরিক্ত চার লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে রাসেল দেশে ফিরে টাকা সংগ্রহ করেন। ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনের কার্যালয়ে হাসান আলীর কাছে তাঁর ভাই মো. হোসেন খান ও মো. জাবেদের উপস্থিতিতে আরও চার লাখ টাকা দেন তিনি। বিমান টিকিটের জন্য নিজে আরও এক লাখ টাকা খরচ করেন।
এরপর ২৮ এপ্রিল সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের এসভি ৮০৫ ফ্লাইটে আবার ইতালি যান রাসেল।
কিন্তু দ্বিতীয়বার ইতালিতে পৌঁছেও তাঁর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে কোনো কাজ না দিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁকে গোপনে অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রির চেষ্টা চলতে থাকে বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতি বুঝে সেখানে থাকা বরিশালের এক ব্যক্তির সহায়তায় রাসেল কক্ষের দরজার লক খুলে পালিয়ে যান। এরপর পূর্বপরিচিত আজাদের কাছে আশ্রয় নেন।
ভুয়া স্পন্সরে ইতালি যাওয়ার বিষয়টি যেভাবে ধরা পড়ে
আজাদের সহায়তায় ৮ জুলাই ইতালি পুলিশের কাছে যান রাসেল। সেখানে কাগজপত্র যাচাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্পন্সরটি আসল নয়।
তদন্তসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মূল মালিকের স্বাক্ষর জাল করে ওই স্পন্সর তৈরি করা হয়েছিল। ইতালি পুলিশের সহায়তায় বিষয়টি জানার পর রাসেলের স্বজনেরা তাঁর জন্য বিমানের টিকিট পাঠান। শেষ পর্যন্ত ১৫ জুলাই সর্বস্ব হারিয়ে তিনি দেশে ফেরেন।
রাসেলের দাবি, তিনি শুধু ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নয়, আরও নগদ অর্থ চক্রটির হাতে দিয়েছেন। তবে এসব অর্থ দেওয়ার কোনো প্রমাণ না থাকায় সেগুলো সিআইডির প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।
সিআইডির তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা
রাসেল দেশে ফিরে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মানবপাচার ও অভিবাসন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলায় মো. হাসান আলী, মো. সাঈদ, মো. হোসেন খান ও মো. জাবেদকে আসামি করা হয়।
আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় সিআইডিকে। সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আবদুল হাকিম তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন।
প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬ ও ৭ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
সিআইডির তদন্তে চক্রটির মূল হোতা হিসেবে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলীকে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বয়স ৪৬ বছর। অন্য আসামিরা হলেন তাঁর বেয়াই মো. সাঈদ, বয়স ৩৮; ভাই মো. হোসেন খান, বয়স ৪২; এবং মো. জাবেদ, বয়স ২৮।
তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও চার আসামির কেউ এখনো গ্রেপ্তার হননি।
বিচার শুরু না হওয়ায় প্রশ্নে দ্রুত বিচার
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়লেও মামলাটির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি এগোয়নি। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, সিআইডির প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে মামলা। আদেশ হওয়ার পর আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিআইডির কর্মকর্তা মো. আবদুল হাকিম জানিয়েছেন, তদন্তে যা পাওয়া গেছে, সেটিই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা আদালত নেবেন।
ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, প্রায় সাত মাস ধরে ট্রাইব্যুনালে নিজস্ব বিচারক না থাকায় তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও এ ধরনের প্রায় ১০০ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়নি। জেলা ও দায়রা জজ (ভারপ্রাপ্ত) অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বিষয়টি দেখছেন এবং মাঝে মাঝে শুনানি হয়।
তাঁর মতে, মানবপাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি যথেষ্ট নয়।
ভুক্তভোগীর দাবি, আরও অনেকেই একই ফাঁদে
রাসেল দাবি করেছেন, তিনি একা নন; একই চক্র আরও অনেকের সঙ্গে এমন প্রতারণা করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতালিতে যাওয়ার আগে তিনি স্পন্সরটি ভুয়া—এ বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
তিনি অভিযোগ করেছেন, ইতালিতে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে মূল মালিকের স্বাক্ষর জাল করে স্পন্সর তৈরি করা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় ইতালির ওই আইনজীবীরাও কারাগারে গেছেন। তবে এই দাবির বিস্তারিত তথ্য সিআইডির প্রতিবেদনে কতটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা সোর্স প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
রাসেল আরও বলেন, চার আসামির মধ্যে সাঈদ ইতালিতে অবস্থান করছেন এবং হাসানসহ অন্যরা বাংলাদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন। তিনি আদালতের কাছে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
অভিবাসনের নামে প্রতারণা ঠেকাতে সতর্কতা জরুরি
রাসেলের ঘটনা দেখাচ্ছে, বিদেশে চাকরি ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির আড়ালে প্রতারণার অভিযোগ কীভাবে গুরুতর মানবপাচারের ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে। এই মামলায় প্রথমে বৈধ স্পন্সর, পিআরসি ও চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ইতালিতে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিশেষ করে স্পন্সর, ভিসা, চাকরির চুক্তি এবং অর্থ লেনদেনের নথি যাচাই না করে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রাসেলের ক্ষেত্রে প্রথমবার ইতালিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ার পরও অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে দ্বিতীয়বার পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে মামলাটি সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণের জন্য আদালতের আদেশের অপেক্ষায়। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।





