হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। ৪ মাসে ১০,৭৬২ টন পণ্য ভারতে গেছে। আমদানি বৃদ্ধি ও রাজস্ব আয়ের বিস্তারিত পড়ুন।
আমদানিনির্ভর দিনাজপুরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি আবারও গতি পেয়েছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এই বন্দর দিয়ে ভারতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দেশি পণ্য পাঠানো হয়েছে। সরকারি হিসাব ও বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, জুলাই থেকে নভেম্বর সময়কালে ৪২৯টি ট্রাকে মোট ১০ হাজার ৭৬২ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিও বেড়েছে। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিক, ট্রাকচালক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কাস্টমস ও সিঅ্যান্ডএফ সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
৪ মাসে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান

হিলি কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি হয়েছে—
-
📦 ট্রাক সংখ্যা: ৪২৯টি
-
⚖️ মোট পণ্য: ১০,৭৬২ মেট্রিক টন
-
🏭 রপ্তানিকৃত পণ্য: বিস্কুট, আসবাবপত্র, প্লাস্টিক পাইপসহ বিভিন্ন দেশি শিল্পপণ্য
একই সময়ে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৪টি ট্রাকে প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন পণ্য। এসব আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ২২৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।
আগের অর্থবছরের তুলনায় কী পরিবর্তন এসেছে
২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় শূন্যের কোঠায় ছিল। তখন মূলত আমদানিনির্ভর এই বন্দরে ভারত থেকে ৮ হাজার ৪৮৭টি ট্রাকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল, যা থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছিল প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে সেই চিত্র বদলেছে। বিশেষ করে দেশি পণ্যের রপ্তানি শুরু হওয়ায় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি নতুন সম্ভাবনার দিক উন্মুক্ত করেছে।
রপ্তানি বাড়ায় ফিরেছে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা
পণ্য আমদানি ও রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরের আশপাশের শ্রমিকদের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। শ্রমিক রকি, তাজুল ও হুমায়ুন জানান, এখন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজের ব্যস্ততা থাকে।
আগে যেখানে দিনে ১০০ টাকা আয় করাও কঠিন ছিল, এখন সেখানে তারা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন। নিয়মিত কাজ থাকায় পরিবার চালানোও সহজ হয়েছে।
ট্রাকচালক ও পরিবহন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব
ট্রাকচালক আতিকুল ও রাব্বির ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে হিলি বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বাড়ায় গাড়িভাড়াও বেড়েছে। প্রতিদিন ট্রিপ পাওয়ায় চালকদের পাশাপাশি গাড়ির মালিকরাও লাভবান হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি বাড়লে দেশের পরিবহন খাতেও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের প্রত্যাশা
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক নূর ইসলাম জানান, গত বছর প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০–১৫টি ভারতীয় ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করত। কিন্তু চলতি বছর আগস্টের মাঝামাঝি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৫০–১৬০টি ট্রাক প্রবেশ করছে।
তার মতে, আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক থাকলে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল সব পেশাজীবী মানুষ উপকৃত হয়। এজন্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
রপ্তানিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা
হিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, এই বন্দর দিয়ে দেশি পণ্য ভারতে রপ্তানি বাড়ায় বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আগে যেখানে এই বন্দর দিয়ে তেমন কোনো পণ্য রপ্তানি হতো না, এখন সেখানে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দরের ফি ও কাস্টমস কার্যক্রম
হিলি পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক অতিশ কুমার শ্যানাল জানান, ভারতে রপ্তানিকৃত প্রতিটি পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য—
-
ওজন ফি: ১৪৬ টাকা
-
এন্ট্রি ফি: ১৬৮ টাকা
এদিকে হিলি কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ বলেন, পচনশীল পণ্য যেমন আদা, রসুন, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ ও মটরশুঁটি দ্রুত ছাড় করতে কাস্টমস সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
কাস্টমস সংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা জানতে বাংলাদেশ কাস্টমসের অফিসিয়াল তথ্য দেখা যেতে পারে
দেশের অর্থনীতিতে হিলি স্থলবন্দরের ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী এই বন্দরটি পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়লে—
-
দেশি শিল্পখাত শক্তিশালী হবে
-
কর্মসংস্থান বাড়বে
-
রাজস্ব আয় স্থিতিশীল হবে
এই বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, হিলি স্থলবন্দর এখন আর শুধু আমদানিনির্ভর নয়। পরিকল্পিত উদ্যোগ, ব্যবসায়ীদের আগ্রহ এবং কাস্টমসের সক্রিয়তায় এই বন্দর দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম ধীরে ধীরে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে হিলি স্থলবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।




