জ্বালানি খাতে অশনিসংকেত, হরমুজ প্রণালি বন্ধ জ্বালানি সংকট ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ। ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন ঝুঁকিতে, এলএনজি আমদানি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় চাপের আশঙ্কা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার জেরে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বন্ধ জ্বালানি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এর সাময়িক বন্ধও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকীর্ণ জলপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক লাফে বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমানে যুদ্ধঝুঁকির কারণে এই রুটের সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে, শিপমেন্ট বিলম্বিত হবে এবং জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের জন্য হুমকি কেন?
বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশের বেশি পূরণ হয় এলএনজি দিয়ে। এই এলএনজির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, বিশেষ করে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়।
কাতার থেকে এলএনজি আমদানির একমাত্র সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালি। ফলে এটি বন্ধ থাকলে এলএনজি সরবরাহের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন,
“এটি যেহেতু সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি—সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়বে। আমাদের বর্তমান মজুত দিয়ে কিছুদিন চালানো যাবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না হলে মার্চ পর্যন্ত সমস্যা হবে না। তবে আমাদের মূল চিন্তা এলএনজি।”
তিনি আরও জানান, আসার কথা থাকা কয়েকটি কার্গোর মধ্যে তিনটির বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাকিগুলো ইতোমধ্যে হরমুজ অতিক্রম করেছে।
বিপিসির অবস্থান: ১৫ দিনের মজুত
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান,
“আমরা চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করি। বর্তমানে ১৫ দিনের বেশি মজুত আছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না হলে আপাতত বড় সমস্যা হবে না।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।
এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলে কী হবে?
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বহু দেশ কাতারনির্ভর। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এই সোর্সিং বন্ধ হয়ে যাবে।
এলএনজি সমুদ্রপথ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে আমদানি সম্ভব নয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সার কারখানা, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও এই গ্যাস ব্যবহার হয়।
সরবরাহ বন্ধ হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে, শিল্প উৎপাদন কমবে এবং সার কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি
গত দুই মাস ধরে ইরানের ওপর হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০–১২ ডলার বেড়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি যেখানে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছিল ৬১ ডলার, তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ ডলারে। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক ফলহীন হওয়ার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা বাড়ছিল। শনিবার মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক হামলার পর দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন,
“আকাশ ও নৌপথে চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সরবরাহ ব্যাহত হলে বড় সংকট তৈরি হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্রব্যমূল্যে সরাসরি প্রভাব পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সারের দাম ও রপ্তানি খাতে প্রভাব পড়বে। আমদানি বিল বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ তৈরি হবে।
গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা
আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে যে পরিমাণ এলএনজি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যদি যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে বড় সংকট এড়ানো সম্ভব। কিন্তু সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি।
পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা স্পষ্ট হবে।






