ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ সালের পর কেবল বিশেষ অনুমোদিতরাই ইন্টারনেট পাবে। জানুন ভেতরের ভয়ংকর তথ্য।
বিশ্বজুড়ে যখন মুক্ত তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরান সরকার ধীরে ধীরে এমন এক কাঠামো বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে, যেখানে সাধারণ জনগণের জন্য বৈশ্বিক ইন্টারনেট কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইরান একপ্রকার স্থায়ী ডিজিটাল অবরোধের যুগে প্রবেশ করবে। আর এর প্রভাব শুধু দেশটির ভেতরেই নয়, বৈশ্বিক ইন্টারনেট শাসনব্যবস্থার জন্যও এক বড় সতর্ক সংকেত।
ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা কী?

ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা মূলত এমন একটি নীতি কাঠামো, যেখানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে নাগরিক অধিকার নয়, বরং ‘রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইরানের ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা Filterwatch জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা গোপনে বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো—ভবিষ্যতে কেবল নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই সীমিত আকারে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।
এর অর্থ, সাধারণ নাগরিকদের জন্য ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার) বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কার্যত অপ্রাপ্য হয়ে উঠবে।
২০২৬ সালের পর কী পরিবর্তন আসতে পারে?
সরকারি মুখপাত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলো ধারণা করছে, ২০২৬ সালের পর ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা আরও কঠোরভাবে কার্যকর হবে।
সে সময়ের পর—
-
অবাধ ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ হতে পারে
-
আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার হবে অনুমতিনির্ভর
-
নাগরিকদের অনলাইন কার্যক্রম পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আসবে
ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার ইতোমধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালু করেছে।
কারা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন?
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী—
-
সরকারি কর্মকর্তা
-
নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি
-
নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তিবিদ
এই শ্রেণির মানুষ যাচাই প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স পাস করলে ফিল্টার করা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন।
অন্যদিকে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে তথাকথিত জাতীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থার মধ্যে।
জাতীয় ইন্টারনেট কী?
জাতীয় ইন্টারনেট হলো ইরানের নিজস্ব নিয়ন্ত্রিত একটি নেটওয়ার্ক, যা কেবল দেশের ভেতরে কাজ করে। এতে রয়েছে—
-
সরকার নিয়ন্ত্রিত মেসেজিং অ্যাপ
-
নিজস্ব সার্চ ইঞ্জিন
-
নেভিগেশন সেবা
-
নেটফ্লিক্সের মতো একটি ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম
তবে এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নজরদারির আওতায় থাকে এবং বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা সফল হলে জাতীয় ইন্টারনেটই হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের একমাত্র ডিজিটাল জগৎ।
চলমান ইন্টারনেট শাটডাউন কতটা ভয়ংকর?
গত ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে কার্যত ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। এর আগে টানা ১২ দিন ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এসব বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। কঠোর দমন-পীড়নের মুখে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও তথ্যপ্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান শাটডাউন ইরানের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও কঠোর। আর এই পরিস্থিতি সরকারকে ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
কেন সরকার এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট?
আমির রাশিদির মতে, সরকার বিশ্বাস করে—
-
ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে আন্দোলন দুর্বল হয়
-
তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়
-
আন্তর্জাতিক চাপ কমে
এই কারণেই সরকার বর্তমান সীমিত ইন্টারনেট ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট এবং এটিকেই ভবিষ্যতের স্থায়ী মডেল হিসেবে দেখছে।
১৬ বছরের পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান হঠাৎ করে এই পথে হাঁটছে না। গত ১৬ বছর ধরে ধাপে ধাপে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা হয়েছে।
এর একটি বড় অংশ হলো হোয়াইটলিস্টিং সিস্টেম—যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারী বৈশ্বিক ইন্টারনেট পান, অন্যরা পান না।
এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো দেশের অনলাইন কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা?
প্রজেক্ট আইনিটা ও আউটলাইন ফাউন্ডেশনের গবেষকদের মতে, এই ব্যবস্থার পেছনে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা থাকতে পারে।
তাদের দাবি অনুযায়ী—
-
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে
-
ইন্টারনেট ট্র্যাফিক রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ সম্ভব
-
নির্দিষ্ট কনটেন্ট মুহূর্তেই ব্লক করা যায়
এই প্রযুক্তি ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখছে।
২০০৯ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
২০০৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথমবার ইরান পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে। এতে—
-
অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় বিপুল
-
আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ে
-
তথ্য নিয়ন্ত্রণে সাময়িক সাফল্য আসে
এই অভিজ্ঞতার পর থেকেই জাতীয় ইন্টারনেট তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা শুরু হয়।
ডিজিটাল অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ইরানের বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংস্থা Access Now জানিয়েছে, এমন নীতি বৈশ্বিক ইন্টারনেটের খণ্ডিতকরণকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে—
-
তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
-
আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হবে
-
তথ্যবিচ্ছিন্ন একটি সমাজ গড়ে উঠবে




