লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড ঘিরে সাদিক খান ও লাইলা কানিংহামের লড়াই ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। জানুন বিশ্লেষণ।
লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক শব্দবন্ধ নয়, বরং এটি ব্রিটিশ রাজনীতির গভীর মেরুকরণের প্রতীক। ২০২৮ সালের নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানী লন্ডনের রাজনীতিতে ধর্ম, পরিচয় এবং নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় অভূতপূর্বভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র সাদিক খানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন আরেক মুসলিম প্রার্থী লাইলা কানিংহাম। এই মুখোমুখি অবস্থান লন্ডনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড কেন আলোচনার কেন্দ্রে

লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড আলোচনায় আসার প্রধান কারণ হলো প্রার্থী বাছাইয়ের কৌশল। ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে তাদের প্রার্থী হিসেবে লাইলা কানিংহামকে সামনে এনে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে।
দলের নেতা নাইজেল ফারাজ প্রকাশ্যেই লাইলা কানিংহামকে লন্ডনের তথাকথিত “ইসলামীকরণ ঠেকানোর অস্ত্র” হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলে ধর্মীয় পরিচয় এখানে কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
লাইলা কানিংহাম: পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্থান
১৯৭৭ সালে লন্ডনের প্যাডিংটনে জন্ম নেওয়া লাইলা কানিংহামের পারিবারিক শিকড় মিসরে। তার বাবা-মা ষাটের দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন।
ছোটবেলা থেকেই তিনি মার্গারেট থ্যাচারের আদর্শে অনুপ্রাণিত। সাত সন্তানের জননী লাইলা নিজেকে একজন রক্ষণশীল মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
তার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে রয়েছে এক নাটকীয় অভিজ্ঞতা। লন্ডনের রাস্তায় তার সন্তানরা অপরাধী চক্রের মুখে পড়লে তিনি পুলিশের অপেক্ষা না করে নিজেই অপরাধীদের শনাক্ত করেন। এই ঘটনায় ব্রিটিশ গণমাধ্যম তাকে “জাগ্রত জননী” আখ্যা দেয়।
পেশাগত জীবন ও বিতর্ক
রাজনীতিতে আসার আগে লাইলা কানিংহাম ছিলেন রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি দপ্তরের একজন পরিচিত প্রসিকিউটর। বাকিংহাম প্রাসাদের ফটকে হামলার মতো সংবেদনশীল মামলাও তিনি পরিচালনা করেছেন।
তবে ২০২৫ সালের জুনে রক্ষণশীল দল ছেড়ে রিফর্ম ইউকে-তে যোগ দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। এর ফলেই তাকে প্রসিকিউটরের পদ ছাড়তে হয়।
বর্তমানে তিনি ওয়েস্টমিনস্টার সিটি কাউন্সিলের ল্যাঙ্কাস্টার গেট এলাকার নির্বাচিত কাউন্সিলর।
ধর্ম নিয়ে কঠোর অবস্থান ও ‘ইসলামায়ন’ বিতর্ক
লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড বিতর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে লাইলা কানিংহামের নিজের ধর্ম নিয়ে অবস্থান। একজন মুসলিম হয়েও তিনি প্রকাশ্যে লন্ডনের “ইসলামায়ন” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তার দাবি, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে লন্ডনের বহু এলাকা ব্রিটিশ পরিচয় হারাচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যারা ব্রিটিশ মূল্যবোধ গ্রহণ করবে না, তাদের এ দেশে থাকার অধিকার থাকা উচিত নয়।
এই বক্তব্য তাকে ডানপন্থী ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে, আবার উদারপন্থীদের কাছে বিতর্কিত করেছে।
‘গ্রুমিং গ্যাং’ ও নিরাপত্তা ইস্যু
কিশোরদের নিয়ে সংঘটিত যৌন হয়রানিতে জড়িত অপরাধী চক্র, যাদের ‘গ্রুমিং গ্যাং’ বলা হয়, সে বিষয়ে লাইলা কানিংহামের বক্তব্য অত্যন্ত কঠোর।
তিনি মহানগর পুলিশের প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তার মতে, বর্তমান পুলিশ নেতৃত্ব লন্ডনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই অবস্থান লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
সাদিক খান বনাম লাইলা কানিংহাম: সমীকরণ কোথায় দাঁড়িয়ে
২০২৬ সালের জানুয়ারির সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, লন্ডনের বাইরের এলাকায় সাদিক খানের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। এর অন্যতম কারণ বিতর্কিত ‘ইউলেজ’ প্রকল্প।
অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকের সমর্থন বাড়ছে। বাজির বাজারে সাদিক খান এখনও এগিয়ে থাকলেও লাইলা কানিংহাম দ্রুত ব্যবধান কমাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড কৌশলকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন লাইলা
লাইলা কানিংহাম ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে প্রথম দিনেই ইউলেজ বাতিল করবেন। এছাড়া—
-
লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড স্বয়ংক্রিয় করা
-
শ্রমিক ইউনিয়নের ধর্মঘট সংস্কৃতি বন্ধ
-
রাস্তায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবায়ন
নিজেকে তিনি লন্ডনের “নতুন শেরিফ” হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড কেবল একটি স্থানীয় কৌশল নয়। এটি ভবিষ্যতের ব্রিটিশ রাজনীতির দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রবণতা জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে
লন্ডনের ইতিহাসে এই প্রথম একজন মুসলিম মেয়রের বিরুদ্ধে আরেক মুসলিম নারীর সরাসরি রাজনৈতিক লড়াই এত গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। লন্ডন মেয়র নির্বাচনে মুসলিম কার্ড ব্যবহার করে ভোটের অঙ্ক কষা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে।
তবে এক বিষয় নিশ্চিত—এই নির্বাচন শুধু লন্ডনের নয়, পুরো ব্রিটিশ রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




