যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় নিয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই অনুমোদনের মূল তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক জেনে নিন।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ধারাবাহিক চাপের মধ্যেও শীতকালীন বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় সরকার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্ত এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভায় অনুমোদিত এ ক্রয় প্রস্তাব দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গৃহস্থালি খাতে গ্যাস সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের ৪৯তম সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয় করবে। চাহিদা অনুযায়ী এই কার্গো দেশের জ্বালানি সরবরাহকে স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় কেন জরুরি?

বাংলাদেশে প্রতি বছর শীতকালে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। আবাসিক খাত, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের অতিরিক্ত ব্যবহার দেখা দেয়। ঠিক এই সময়েই যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে কাজ করবে।
কর্মকর্তাদের মতে, শীতকালীন চাহিদা পূরণের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক বাজারেও এলএনজির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় এখনই ক্রয়ের উপযুক্ত সময়।
ক্রয় মূল্য ও অর্থায়ন কাঠামো
সরকার অনুমোদন দিয়েছে যে, পেট্রোবাংলা যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ১০.৩৭ মার্কিন ডলার দরে এলএনজি ক্রয় করবে।
🔹 মোট খরচ: ৪৩৬ কোটি ৭ লাখ টাকা
🔹 ক্রেতা: পেট্রোবাংলা
🔹 সরবরাহকারী: TotalEnergies Gas & Power Ltd., UK
বৈদেশিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে এই দামে এলএনজি ক্রয় বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের সিদ্ধান্তের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
শীতকালীন জ্বালানি সংকট মোকাবিলা
শীতকালে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহার দেখা যায়। নতুন কার্গো সরবরাহ এ চাহিদা ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করবে।
শিল্প ও উৎপাদন খাত সচল রাখা
গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত এলএনজি এনে সরকার উৎপাদনকে সচল রাখার চেষ্টা করছে।
স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদন
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকলে লোডশেডিং বাড়ে। এলএনজি সরবরাহ সেই ঝুঁকি কমাবে।
আন্তর্জাতিক বাজার অনুকূলে থাকা
এ মুহূর্তে এলএনজির আন্তর্জাতিক দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল। তাই মূল্য ঝুঁকি কম।
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার
বৈশ্বিক জ্বালানি অনিশ্চয়তার মধ্যেও এ সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে।
শীতকালীন জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় সরকারের কৌশল
কর্মকর্তারা জানান, সারা বছরই গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও শীতকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। রান্নার চুলা, হিটার, বাণিজ্যিক ব্যবহার—সব মিলিয়ে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে আগেভাগে এলএনজি আমদানি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যাতে:
✔ গ্যাসচালিত শিল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়
✔ গৃহস্থালি ব্যবহারকারীরা চুলায় গ্যাস সংকটে না পড়ে
✔ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত না হয়
হাওর অঞ্চলে নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন
একই সভায় ‘হাওর এলাকায় ফ্লাইওভার সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর একটি বড় নির্মাণ প্যাকেজ অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
🔹 খরচ: ৩৪৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা
🔹 অবস্থান: সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা
🔹 কাজ পাবে: এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওর অঞ্চলের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা বহু গুণ উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে হাওর এলাকায় দুর্যোগ সহনশীল সড়কের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। নতুন অবকাঠামো এ দুর্বলতা কাটাতে সহায়তা করবে।
যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে ঠিকই, কিন্তু স্বল্পমেয়াদে এ ধরনের এলএনজি ক্রয় দেশের জন্য প্রয়োজনীয়।
তাদের মতে—
“উৎপাদন ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল একটি দেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই মুখ্য। যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় সিদ্ধান্ত তাই সময়োপযোগী।”
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনায় কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে—
✔ গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো
✔ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ
✔ আন্তর্জাতিক লং-টার্ম এলএনজি চুক্তি
✔ দক্ষ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ওয়ান-টাইম কার্গো আমদানি দেশের জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কার্যকর হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত শীতকালীন জ্বালানি চাপ কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাজ্য থেকে এলএনজি ক্রয় দেশের গ্যাস সরবরাহে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দেবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে। পাশাপাশি হাওর অঞ্চলে নতুন অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদনও স্থানীয় উন্নয়নের গতি বাড়াবে।




