সৌদির হুতিদের ওপর হামলার অভিযান ঘিরে ইয়েমেনে উত্তেজনা বাড়ছে। বাব আল-মানদেব নিরাপদ রাখতে সীমিত হামলা বা বড় অভিযানের দুটি পরিকল্পনা বিবেচনায় আছে। সময় নিশ্চিত নয়।
সৌদি আরব ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ রাখতে সৌদি আরব উপকূলীয় এলাকায় সীমিত অভিযান অথবা ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় একযোগে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে ছয়জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয়নি। ফলে সৌদির হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান ঠিক কখন শুরু হবে কিংবা শেষ পর্যন্ত কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সৌদির হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে যে দুই পরিকল্পনা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব মূলত দুটি সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে। প্রথমটি হলো বাব আল-মানদেব এলাকায় সীমিত অভিযান চালিয়ে উপকূলীয় নৌপথের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়টি হলো ইয়েমেনের একাধিক এলাকায় একযোগে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা।
বড় ধরনের অভিযান হলে সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে থাকা এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা এতে অংশ নিতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব স্থলবাহিনীকে সৌদি বিমানবাহিনী আকাশপথে সহায়তা করতে পারে।
তবে Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য অভিযানের পরিধি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, অভিযান হলে তা নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সীমিত পরিসরে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় নতুন অভিযানের ব্যাপ্তি ছোট হতে পারে।
বাব আল-মানদেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল-মানদেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও প্রণালীটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সামুদ্রিক chokepoint হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুতিদের উপকূলীয় অগ্রযাত্রার কারণে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, বাব আল-মানদেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তারা বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।
এই কারণেই সৌদি আরবের কাছে নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকা
সৌদির হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সৌদি আরবকে ইয়েমেনে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে।
তবে সরাসরি বিমান হামলায় সহায়তার জন্য সৌদি আরবের একটি অনুরোধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকচ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি মিত্র দেশগুলো মূলত প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিচ্ছে এবং তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তুরস্ক ও পাকিস্তানও সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পাকিস্তান সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের ঘাঁটি এডেনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধের সরঞ্জাম পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি বাহিনীকে সহায়তা করছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে ইয়েমেনে যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তান কোনো সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ফ্রান্সও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
সৌদি আরবের প্রধান উদ্বেগ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
সম্ভাব্য অভিযানের পেছনে সৌদি আরবের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। বিশেষ করে তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষাকে রিয়াদ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান শুধু ইয়েমেনের ভেতরের স্থল পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না; সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তাও এর সঙ্গে যুক্ত।
Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা এবং লোহিত সাগর উপকূলে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়াই সৌদি আরবের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
২০১৫ সালের যুদ্ধ থেকে নতুন পরিস্থিতি
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব ২০১৫ সালে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে দেশটি একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দেয়। এর আগে ইরান-সমর্থিত হুতিরা রাজধানী সানা থেকে ওই সরকারকে সরিয়ে দিয়েছিল।
২০২২ সালে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর প্রভাব ইয়েমেনেও পড়ে এবং হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনা বাড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনী বড় চ্যালেঞ্জ
সম্ভাব্য সৌদির হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করবে ইয়েমেনি স্থলবাহিনীর সক্ষমতার ওপর। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অতীতে হুতিবিরোধী বিভিন্ন ইয়েমেনি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
কিন্তু এসব বাহিনী এখনো পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ নয়। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন সৌদি আরবের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইয়েমেন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার মতো প্রস্তুতি অনেক ইয়েমেনি বাহিনীর এখনো নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হুতিরা একাধিক এলাকায় চাপ তৈরি করছে এবং গত শীতেও ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর বিভক্তি আরও বেড়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা নতুন এলাকা দখলের চেষ্টা করলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পরে ওই বাহিনী পরাজিত হয়।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান সফল হবে কি না, তা অনেকটাই ইয়েমেনি স্থলবাহিনীর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। এতদিন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা; সম্ভাব্য নতুন অভিযানে তাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যেতে হবে।
অভিযান শুরু হলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা
হুতিরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে লেবাননের হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ায় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন এসেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদির হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য অভিযানের লক্ষ্য সীমিত রাখা হবে, নাকি একাধিক এলাকায় বড় আকারের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
কবে শুরু হতে পারে অভিযান
সংশ্লিষ্ট ছয়জনের ধারণা অনুযায়ী, অভিযান এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে অথবা নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও তা শুরু হতে পারে। অর্থাৎ সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এখন পর্যন্ত সৌদি আরব, ইয়েমেন, হুতি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। ফলে সামরিক প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেলেও অভিযান বাস্তবে কখন এবং কী মাত্রায় শুরু হবে, সেটি পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে রয়েছে।
সৌদি আরবের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং বাব আল-মানদেবের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখলের কথা উঠে এসেছে। মাইকেল র্যাটনির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হতে পারে নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে হুতিদের কৌশলগত সুবিধা কমানো।
নৌপথের নিরাপত্তা ও সংঘাতের ঝুঁকি
বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যপথে প্রভাব পড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সময়ে ইয়েমেনের ভেতরে বিভক্ত সামরিক কাঠামো, হুতিদের শক্ত অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত—সব মিলিয়ে সম্ভাব্য অভিযানকে জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে তাই মূল প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত সীমিত উপকূলীয় অভিযান বেছে নেবে, নাকি একাধিক ফ্রন্টে বড় সামরিক পদক্ষেপ নেবে। এর উত্তর নির্ভর করছে রিয়াদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, ইয়েমেনি বাহিনীর প্রস্তুতি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তার ওপর।





