এইমাত্র

আরও খবর

Shikor Web Image - 2026-03-02T154943.068
জ্বালানি খাতে অশনিসংকেত
Shikor Web Image - 2026-03-01T151104.936
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যে প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে
Shikor Web Image (20)
ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা
Shikor Web Image (17)
দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না সরকার
Shikor Web Image (82)
চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা গুটিয়ে নেব: ডিসিসিআই

রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি

রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি এখন শুধু একটি প্রকল্পগত ইস্যু নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, বৈদেশিক ঋণ ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। এর মধ্যেই প্রকল্পের ব্যয় আরও ২৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নিয়ে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ স্পষ্ট হচ্ছে।


রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি কেন আলোচনায়

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলোর একটি। সর্বশেষ সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী—

  • মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা

  • যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি

  • প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত

এই ব্যয় বৃদ্ধি রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।


ব্যয় ও মেয়াদ—দুই দিকেই বড় পরিবর্তন

২০১৬ সালে অনুমোদিত মূল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে।

প্রথমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও পরে দেখা যায়—

  • ডলার-টাকা বিনিময় হার সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি

  • প্রকৃত ব্যয় হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে

ফলে পুনর্মূল্যায়নের পর ব্যয় আরও বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • টাকার অবমূল্যায়ন

  • বৈদেশিক ঋণের হিসাব পরিবর্তন

  • নির্মাণ বিলম্ব


ঋণের চাপ ও ডলার বিনিময় হারের প্রভাব

রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে—

  • ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করছে রাশিয়া

  • এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৭.৭০ বিলিয়ন ডলার

ডলার বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে টাকায় ঋণের চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। একসময় যেখানে ঋণের বোঝা ছিল প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা, এখন তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা

এই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।


চুক্তি, নির্মাণ ও নতুন চ্যালেঞ্জ

এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃসরকার চুক্তির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে রাশিয়ার Atomstroyexport

প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—

  • দুটি ইউনিটে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন

  • প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ

  • পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ

তবে সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।


উৎপাদন সূচি অনিশ্চিত কেন

ডিসেম্বরে প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—

  • অসমাপ্ত কাজের তালিকা চূড়ান্ত হয়নি

  • কমিশনিং টাইমলাইন স্পষ্ট নয়

  • আন্তর্জাতিক মান অনুসারে পরীক্ষা এখনো বাকি

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে


অর্থনৈতিক ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তার ঝুঁকি

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, ব্যয়ের সঠিক হিসাব না হলে—

  • ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ বাড়বে

  • বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ ভুল হতে পারে

  • জাতীয় ভর্তুকির চাপ বাড়বে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি সরাসরি বিদ্যুৎ নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।


বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপকরা মনে করছেন—

  • ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে

  • বিলম্বের কারণে যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল কমছে

  • জনবল ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়ছে

এর ফলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।


পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পরিকল্পনা কমিশন

পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের—

  • অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

  • আয়-ব্যয় কাঠামো

  • ঋণ পরিশোধ ঝুঁকি

সবকিছু পুনরায় মূল্যায়ন করছে। সাম্প্রতিক রিপোর্টে সমন্বয় জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক ব্যয় বৃদ্ধি শুধু একটি বাজেট সংশোধনের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ পরিকল্পনা, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় শক্তি নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

সময়সীমা ও ব্যয়ের লাগাম এখনই না টানতে পারলে এই প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সর্বাধিক পঠিত