ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ প্রসঙ্গে যা বললেন মামুনুল হক। অভিযোগ, ক্ষোভ ও বিতর্কের দ্রুত সুরাহার আহ্বান জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বর্তমানে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থানরত তিনি মঙ্গলবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এ বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে মূলত আলেম সমাজের প্রতিবাদ, ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন এবং ঘটনাটির প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে কী লিখেছেন মামুনুল হক?
‘প্রসঙ্গ বনলতা এক্সপ্রেস ও আলেম সমাজের ক্ষোভ!’ শীর্ষক স্ট্যাটাসে মামুনুল হক আলেম সমাজের ধর্মীয় কার্যক্রমকে দুটি প্রধান ভাগে ব্যাখ্যা করেন।
তার মতে, এক ধরনের কার্যক্রম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, শিক্ষা দেওয়া এবং কল্যাণকর পথে আহ্বান করার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইসলামের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও দাওয়াহমূলক কাজ এ ধারার অন্তর্ভুক্ত। এসব ক্ষেত্রে হিকমাহ বা উত্তম কর্মকৌশল এবং নসিহাহ বা কল্যাণকামী উপদেশ প্রধান ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে, সমাজে সৎ কাজ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় প্রতিরোধের দায়িত্বও আলেম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এ ক্ষেত্রে ‘সামর্থ্য’ বা সক্ষমতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সক্ষমতার প্রশ্ন
মামুনুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যায় প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা সক্ষমতার প্রথম স্তর। তিনি বলেন, ইমানদারদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকলে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ তাদের মৌলিক দায়িত্বের অংশ হয়ে যায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে ইসলামি বা শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই। ফলে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতাও সব ক্ষেত্রে সমান নয়।
তার ব্যাখ্যায়, আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে কটূক্তি, কোরআনের বিধানকে কটাক্ষ করা কিংবা ইসলামী ঐতিহ্যের অবমাননার মতো ঘটনার প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও সক্ষমতার বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচিত হয়।
মামুনুল হক বনলতা এক্সপ্রেস বিতর্কে যে প্রশ্ন তুললেন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন মামুনুল হক।
তার মতে, ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে—এমন কোনো আপত্তিকর ঘটনা সত্যিই ঘটেছে কি না, তা জনসম্মুখে আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
তিনি ইঙ্গিত করেন যে, ঘটনার পেছনে কী ঘটেছে এবং কেন প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। কারণ, প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছাড়া পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
দুটি গুরুতর অভিযোগের প্রসঙ্গ
স্ট্যাটাসে মামুনুল হক উল্লেখ করেন যে, ঘটনাটিকে ঘিরে দুটি গুরুতর অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।
প্রথমত, পবিত্র বাইতুল্লাহ শরিফের অবমাননার অভিযোগ।
দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ফখরে বাঙাল তাজুল ইসলামের সম্মানহানির অভিযোগ।
তিনি বলেন, যদি পবিত্র বাইতুল্লাহ শরিফের অবমাননার মতো কোনো ঘটনা সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে তিনি অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
ক্ষোভের কারণ দ্রুত স্পষ্ট করার আহ্বান
মামুনুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্ষোভের পেছনে যদি উল্লিখিত অভিযোগগুলো দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত সেগুলো আমলে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, যদি শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীই প্রতিবাদের মূল কারণ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টির মূল্যায়ন ভিন্নভাবে করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষায়, পুরো ঘটনাকে ঘিরে এক ধরনের “ধূম্রজাল” বা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা জরুরি।
আলেম সমাজের প্রতিবাদ নিয়ে মন্তব্য
স্ট্যাটাসের শেষাংশে মামুনুল হক বলেন, আলেম সমাজ ও ইসলামি জনতার প্রতিবাদী ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, প্রতিবাদের কারণ, উদ্দেশ্য এবং প্রেক্ষাপট স্পষ্ট না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই আলোচিত ঘটনাটির বাস্তবতা ও অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা সামনে আসা প্রয়োজন।
ঘটনাপ্রবাহের সারসংক্ষেপ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের মক্কা থেকে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে মামুনুল হক ঘটনাটিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং আলেম সমাজের ক্ষোভের কারণ খোলাসা করার ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি একদিকে অভিযোগগুলোর গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন, অন্যদিকে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছেন। ফলে আলোচিত এই ইস্যুতে তার বক্তব্য নতুন করে জনআলোচনার জন্ম দিয়েছে।





