ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে সৌদি আরবসহ ৭ দেশ যোগ দিয়েছে। এই উদ্যোগ কি গাজায় স্থায়ী শান্তি আনবে, নাকি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে?
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত এই আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরসহ মোট ৭টি দেশ যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ঘোষণার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ বন্ধে একটি নতুন কাঠামো সামনে এসেছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এই বোর্ড কি সত্যিই শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যকর পথ, নাকি এটি জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক উদ্যোগ?
কোন কোন দেশ যুক্ত হচ্ছে ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যেসব দেশ যোগ দিতে সম্মত হয়েছে, তারা হলো—
-
সৌদি আরব
-
তুরস্ক
-
মিসর
-
জর্ডান
-
ইন্দোনেশিয়া
-
পাকিস্তান
-
কাতার
এ ছাড়া ইসরায়েল আগেই প্রকাশ্যে বোর্ডে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কানাডা ও যুক্তরাজ্যকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যদিও তারা এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, মরক্কো ও ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।
পুতিন কি সত্যিই বোর্ডে যোগ দিচ্ছেন?
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (দাভোস) বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তবে পরে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিষয়টি এখনো পর্যালোচনাধীন।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, পুতিন জানিয়েছেন—রাশিয়া গাজা পুনর্গঠনে ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিতে প্রস্তুত, যদিও বোর্ডে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
‘বোর্ড অব পিস’ কী? কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস মূলত একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার লক্ষ্য—
-
গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি জোরদার
-
যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন তদারকি
-
সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা
ফাঁস হওয়া সনদ অনুযায়ী, এই বোর্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র শান্তি সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর চেয়ারম্যান হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এবং তার হাতে নির্বাহী বোর্ড গঠন ও বিলুপ্ত করার বিস্তৃত ক্ষমতা থাকবে।
কেন এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে
যদিও ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস শান্তির লক্ষ্য সামনে রেখে গঠিত, তবুও বিভিন্ন মহলে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রথমত, প্রস্তাবিত সনদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের নাম নেই। দ্বিতীয়ত, এই বোর্ড জাতিসংঘের কিছু ভূমিকার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা।
স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলোব প্রকাশ্যে এই বোর্ডে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ করতে পারে।
নির্বাহী বোর্ডে কারা আছেন
হোয়াইট হাউস ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের ৭ সদস্যের নাম ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
-
মার্কো রুবিও (মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী)
-
স্টিভ উইটকফ (মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত)
-
জ্যারেড কুশনার (ট্রাম্পের জামাতা)
-
টনি ব্লেয়ার (যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী)
টনি ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে বিতর্ক তৈরি করেছে, কারণ তিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
গাজা যুদ্ধ ও শান্তি পরিকল্পনার বর্তমান বাস্তবতা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের সূচনা হয়। এতে প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জন জিম্মি হন।
এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৭১,৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। সাম্প্রতিক হামলায় ৪৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
বোর্ড অব পিসে যোগদানের শর্ত কী
একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে—
-
বোর্ডে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়
-
তবে স্থায়ী সদস্য হতে হলে ১ বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হবে
-
সদস্যদের মেয়াদ হবে ৩ বছর, নবায়নযোগ্য
এই অর্থ গাজার পুনর্গঠনে ব্যবহারের কথা বলা হলেও, আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইসরায়েলের আপত্তি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, গাজা নির্বাহী বোর্ডের গঠন তাদের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই করা হয়েছে। বিশেষ করে তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল।
এই বিষয়টি ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস বাস্তবায়নে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষণ: শান্তির সম্ভাবনা নাকি নতুন বিতর্ক?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ একদিকে যেমন গাজা সংকটে নতুন কূটনৈতিক পথ খুলতে পারে, অন্যদিকে এটি—
-
জাতিসংঘের কর্তৃত্ব দুর্বল করতে পারে
-
একক নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়াতে পারে
-
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস শান্তির চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
ভ্যাটিকান নিশ্চিত করেছে, পোপ লিও আমন্ত্রণ পেয়েছেন। তবে তিনি এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ বিষয়টি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এই বোর্ড কার্যকর হতে হলে অন্তত তিনটি দেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু বিতর্কিত উদ্যোগ। এটি গাজায় শান্তি আনতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়নের ওপর। আপাতত, এই বোর্ড বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনার অধ্যায় খুলে দিয়েছে—যার ফলাফল জানতে সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক।




