তেল-গ্যাসের পর এবার দাম বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১.৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রস্তাব বিইআরসিতে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপের মধ্যে এবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১.৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-তে পাঠিয়েছে। এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুৎ খরচে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির পরপরই এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব সামনে আসায় সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাতে নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব কী এবং কেন এলো?
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান এবং ভর্তুকির চাপ কমাতে এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত সোমবার এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব বিইআরসিতে পাঠানো হয়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোই সরাসরি দাম বাড়ানোর আবেদন করে। তবে এবার প্রক্রিয়াগত ব্যতিক্রম ঘটেছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া

এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব অনুযায়ী এখন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (বিপিডিবি) সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানিগুলো নতুন করে আবেদন প্রস্তুত করছে। তারা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই কমিশনে তা জমা দিতে পারে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা আইন অনুসারে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর গণশুনানি শেষে কমিশন নতুন দাম নির্ধারণ করবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে আগামী মাসের শুরু থেকেই নতুন দাম কার্যকর হতে পারে।
পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পরিবর্তন
এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১.৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে।
খুচরা পর্যায়ে ব্যবহারভিত্তিক স্তর অনুযায়ী ভিন্ন হারে মূল্য সমন্বয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাসে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী “লাইফলাইন গ্রাহক”দের এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব থেকে আপাতত বাদ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে।
ভর্তুকির চাপ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের তুলনায় প্রায় ৫.৫০ টাকা বেশি। ফলে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাবকে একটি অর্থনৈতিক সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দাম বাড়তে থাকলে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচেও চাপ পড়বে।
এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এবারের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতে সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি
এর আগে জ্বালানি তেল ও এলপিজির দামেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম দুই দফায় ৫৯৯ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে নতুন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নীতিগত প্রেক্ষাপট
সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে এলএনজি, কয়লা ও তেলের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এছাড়া অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী “ক্যাপাসিটি চার্জ” দিতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাব অর্থনৈতিকভাবে চাপ কমানোর একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।




