ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যে প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। জেনে নিন জ্বালানি, রপ্তানি ও শ্রম বাজারে কেমন পরিবর্তন আসতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ জানিয়েছেন, “বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সবসময় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার হয়।”
এ বিষয় নিয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যই বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস। যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হবে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব
ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, “দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে কাজ না করায় আমরা এখন মূলত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।”
তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। “যুদ্ধ চলতে থাকলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ব,” তিনি যোগ করেন।
হারুন-উর-রশিদ আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে হুতি হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। রাশিয়া ও চীন যদি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রপ্তানি ও শ্রমবাজারে ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রভাব
পলিসি বিশেষজ্ঞ মাসরুর রিয়াজের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ সেখানে নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “আমরা একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ। যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমবে, ফলে পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমবে।”
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। পাশাপাশি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হলে সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যেসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে
-
জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহ:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। -
রপ্তানি পথ ও পরিবহন:
সুয়েজ খালসহ প্রধান নৌপথ ইরানের কাছে অবস্থিত। এখানে যুদ্ধের প্রভাব পড়লে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে। -
শ্রমবাজারে প্রভাব:
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। -
পণ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি:
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে স্থানীয় উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পাবে। -
বাজার ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা:
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমতে পারে, এবং ভোক্তাদের খরচ কমে যাবে।
মাহমুদ হাসান খান উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ইউক্রেন যুদ্ধ প্রথমে দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এখন চার বছর ধরে চলছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ অন্যান্য রপ্তানি বাজার মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইরানের প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে ১০.৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার বেশিরভাগ পোশাক ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য।




