জ্বালানির জন্য মরিয়া হয়ে যেভাবে চীন-রাশিয়া-ইরানের দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা, হরমুজ প্রণালি জ্বালানি সংকট বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে।
হরমুজ প্রণালি জ্বালানি সংকট এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের ফলে দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র দেশগুলোও বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে এশিয়া থেকে ইউরোপ—সবখানেই।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানির লাইফলাইন
বিশ্বে মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ইরান এই পথ বন্ধ করে দেয়, যা জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দেয়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, যার অন্যতম শর্ত ছিল প্রণালি পুনরায় চালু করা।
তবে বাস্তবে এখনও খুব সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে, যা সংকট পুরোপুরি কাটেনি—এটাই ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কৌশলগত পরিবর্তন
এই হরমুজ প্রণালি জ্বালানি সংকট যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অবস্থান বদলে দিয়েছে। আগে যেসব দেশ মার্কিন নিরাপত্তা ও জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে।

বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো—
- জাপান
- দক্ষিণ কোরিয়া
- থাইল্যান্ড
- ফিলিপাইন
ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে। একই সঙ্গে রাশিয়া থেকেও জ্বালানি আমদানি বাড়ানো হচ্ছে।
এশিয়ায় সংকটের তীব্রতা
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, তারা হঠাৎ করেই প্রধান জ্বালানি উৎস হারিয়েছে।
ফিলিপাইন প্রথম দেশ হিসেবে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে।
দেশটি পাঁচ বছর পর আবার রাশিয়া থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে।
এছাড়া:
- ইরানের সঙ্গে জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা
- চীনের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা পুনরায় শুরু
এগুলো তাদের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পদক্ষেপ
জাপানের কাছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৌশলগত তেল মজুদ রয়েছে। দেশটি ইতোমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া:
- ইরানে বিশেষ দূত পাঠাচ্ছে
- কাজাখস্তান, ওমান, সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ করছে
- চার বছর পর রাশিয়া থেকে ন্যাফথা আমদানি শুরু করেছে
এগুলো স্পষ্ট করে যে, তারা দ্রুত বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে চাইছে।
চীনের কৌশলগত সুবিধা
এই সংকটে পরোক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে চীন।
কারণ:
- বড় তেল মজুদ
- স্থলভিত্তিক পাইপলাইন
- নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি
চীন ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন চাইলে পুরো এশিয়ার জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়া ও ইরানের অর্থনৈতিক লাভ
এই সংকট রাশিয়া ও ইরানের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
- রাশিয়ার আয় (শুধু মার্চে): ৩.৩–৫ বিলিয়ন ডলার
- ইরানের তেল বিক্রি:
- আগে: ১০ লাখ ব্যারেল/দিন
- এখন: ১৭ লাখ ব্যারেল/দিন
- তেলের দাম: ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে
এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থেকেও ইরানের বড় অঙ্কের আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নতুন বাস্তবতা
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনির অধ্যাপক রক শি বলেন,
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিলেও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ রক্ষা করতে পারেনি।
তার মতে:
এশিয়ার দেশগুলো এখন ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতা কি জ্বালানি সরবরাহ পর্যন্ত বিস্তৃত?
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ রবার্ট ওয়াকার বলেন,
প্রতিটি দেশের সিদ্ধান্ত তাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও জরুরিতার ওপর নির্ভর করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-মিত্র সম্পর্কে চাপ
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জন কয়েন সতর্ক করে বলেছেন,
রাশিয়া বা ইরানের সঙ্গে সরাসরি জ্বালানি চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়াতে পারে।
এই সংকট শুধু এশিয়ায় নয়, ইউরোপেও প্রভাব ফেলছে।
ফ্রান্স ও ইতালিও ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে।
সামরিক উত্তেজনা ও ঝুঁকি
ইরান পাল্টা হামলায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়েছে।
এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালি জ্বালানি সংকট: ভবিষ্যৎ কী?
এই হরমুজ প্রণালি জ্বালানি সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্য ও জোট রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।
সম্ভাব্য পরিবর্তন:
- জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য বৃদ্ধি
- যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো
- চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি
- আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য পুনর্গঠন
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র বদলে দিতে পারে।




