যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতি ডলারের ৭০ সেন্ট দেয়ার দিন শেষ, কানাডার প্রতিরক্ষা কৌশল পরিবর্তন নিয়ে মার্ক কার্নির ঘোষণা—যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শক্তি বৃদ্ধির বড় পরিকল্পনা বিস্তারিত জানুন।
কানাডার প্রতিরক্ষা কৌশল পরিবর্তন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। মন্ট্রিয়ালে অনুষ্ঠিত লিবারেল পার্টির জাতীয় সম্মেলনে তিনি জানান, দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর সামরিক ব্যয় কাঠামো থেকে সরে এসে কানাডা এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার লক্ষ্য।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কানাডা আর প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে চায় না। বরং দেশীয় শিল্প, শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি নতুন পথ তৈরি করা হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তার বক্তব্যে বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা খাতে প্রতি ডলারের মধ্যে ৭০ সেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর যুগ শেষ।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি কানাডার বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যয় কাঠামোর একটি মৌলিক পরিবর্তনের ঘোষণা দেন।
তার বক্তব্যে উপস্থিত প্রতিনিধিরা করতালির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান, যা রাজনৈতিকভাবে এই নীতির প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।
দেশীয় শিল্পের ওপর জোর
কার্নি জোর দিয়ে বলেন, কানাডার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি গড়ে তোলা হবে সম্পূর্ণ দেশীয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে রয়েছে—
- দেশীয় ইস্পাত
- অ্যালুমিনিয়াম
- কাঠ
- স্থানীয় শ্রমশক্তি
এই উদ্যোগের মাধ্যমে কানাডা একদিকে যেমন নিজস্ব শিল্পকে শক্তিশালী করতে চায়, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা

প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ককে তিনি তাৎক্ষণিক বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রতিরক্ষা কৌশল পরিবর্তন শুধুমাত্র সামরিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় ঐক্য বড় চ্যালেঞ্জ
কার্নির মতে, দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং অভ্যন্তরীণ স্বার্থ সংরক্ষণ করা। তিনি মনে করেন, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ কাঠামো ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক কৌশল সফল হতে পারে না।
‘বাই কানাডিয়ান’ নীতি ও রপ্তানি লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী ‘বাই কানাডিয়ান’ নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এই নীতি—
- স্থানীয় ব্যবসা ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে
- বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াবে
- বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাবে
এছাড়া কানাডা আগামী এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা দেশটির বাণিজ্য নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব
কানাডার প্রতিরক্ষা কৌশল পরিবর্তন: আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানোর একটি বিকল্প পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে কানাডার প্রতিরক্ষা উৎপাদনের বড় অংশই রপ্তানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ পণ্য যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ‘ফাইভ আইজ’ জোটভুক্ত দেশগুলোতে।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় সুযোগ
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কানাডা প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্তত ৭০ শতাংশ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি দেশীয় শিল্পের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে—
- স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়বে
- কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে
- প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে দেশগুলো এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।
কানাডার প্রতিরক্ষা কৌশল পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপান্তরের সূচনা। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শক্তি বৃদ্ধি এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে কানাডা একটি নতুন অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।




