২০২৫ সালে দেশের ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। ২০২৬ নিয়েও জোরালো সতর্কতা, জানুন বিস্তারিত।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে বলে জানিয়েছে গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস। জাতিসংঘ, এফএও, ডব্লিউএফপি, আইএফএডি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্যভিত্তিক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত, জলবায়ু ঝুঁকি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কেন আলোচনায়
গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিসে বাংলাদেশকে এমন ১০টি দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে, যেখানে বিশ্বের তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রীভূত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ “সংকটজনক পর্যায় ৩”-এ ছিল। অন্যদিকে ৪০ লাখ মানুষ ছিল “জরুরি পর্যায় ৪”-এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায়।
এ তথ্য শুধু খাদ্যপ্রাপ্তির সংকট নয়, বরং জীবনযাত্রা, পুষ্টি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর চাপেরও ইঙ্গিত দেয়।
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সংকট বাংলাদেশে কিছুটা উন্নতির চিত্রও আছে
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
এই উন্নতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
- বছরের শুরুতে বড় দুর্যোগ না হওয়া
- খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে আসা
- প্রবাসী আয় বাড়া
এই উপাদানগুলো খাদ্যপ্রাপ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতায় কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তবে এই উন্নতি সামগ্রিক ঝুঁকি দূর করেনি। কারণ প্রতিবেদন একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর সতর্কতাও দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সংকট বাড়ছে, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরও নাজুক
দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক চিত্রে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের দুটি জেলায় আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন করে শরণার্থী আগমন, বন্যা পরিস্থিতি এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এটি কেবল মানবিক সংকট নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের সঙ্গেও যুক্ত।
যেসব দেশের সঙ্গে একই তালিকায় বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশকে উচ্চ ঝুঁকিতে রাখা হয়েছে—
- আফগানিস্তান
- কঙ্গো
- মিয়ানমার
- নাইজেরিয়া
- পাকিস্তান
- দক্ষিণ সুদান
- সুদান
- সিরিয়া
- ইয়েমেন
বাংলাদেশ ও সিরিয়ায় কিছু উন্নতির কথা বলা হলেও আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়ের পরিস্থিতির অবনতি উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে “মাঝারি মাত্রার পুষ্টিসংকট” থাকা দেশ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৬ নিয়ে কেন বড় উদ্বেগ
প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—২০২৬ সালেও তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বহাল থাকতে পারে।
চলমান সংঘাত, জলবায়ু অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত।
প্রতিবেদন বলছে—
- নতুন বাস্তুচ্যুতি বাড়তে পারে
- খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে
- জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা কমবে
- বৈশ্বিক কৃষি-খাদ্য বাজারে বিঘ্ন তৈরি হতে পারে
এই ঝুঁকির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব খাদ্যসংকটে থাকা দেশগুলোকে আঘাত করতে পারে।
ক্ষুধার প্রধান কারণ এখনো সংঘাত

বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হিসেবে সংঘাত ও সহিংসতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯টি দেশের ১৪ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ সংঘাতজনিত খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত।
এটি বৈশ্বিক তীব্র ক্ষুধাগ্রস্ত মানুষের অর্ধেকেরও বেশি।
অন্যদিকে—
চরম আবহাওয়া
১৬টি দেশের ৮ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ জলবায়ু ও চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
১২টি দেশের ২ কোটি ৯৮ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক ধাক্কায় তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট, খাদ্যসংকট শুধু কৃষি উৎপাদনের সমস্যা নয়—এটি সংঘাত, অর্থনীতি ও জলবায়ুর সমন্বিত সংকট।
মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার ঝুঁকি
প্রতিবেদন আরও বলছে, খাদ্যসংকটে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন অর্থায়ন কমে গেছে।
এই সহায়তা ২০১৬-১৭ সালের স্তরে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ সংকট বাড়ার সময় অর্থায়ন কমে গেলে দুর্বল জনগোষ্ঠী আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অপুষ্টির শিকার একটি প্রজন্ম
প্রতিবেদন শিশু ও নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়েও গুরুতর সতর্কতা দিয়েছে।
২০২৫ সালে—
- ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগেছে
- প্রায় এক কোটি শিশু মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকিতে
- ২ কোটি ৫৭ লাখ শিশু মাঝারি তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত
- ৯২ লাখ অন্তঃসত্ত্বা ও দুগ্ধদানকারী নারী অপুষ্টির শিকার
এটি শুধু তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশ ও মানবসম্পদেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈশ্বিক বাজার ঝুঁকি কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিবেদন বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি ও সার রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদি পরিবহন ব্যাহত হয় এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বৈশ্বিক কৃষি-খাদ্য বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
সামনে কী বার্তা দিচ্ছে এই প্রতিবেদন
গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিসের মূল্যায়ন স্পষ্ট—খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এখন শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশে কিছু উন্নতির লক্ষণ থাকলেও ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের খাদ্যসংকট দেখায় ঝুঁকি এখনো বড়।
বিশেষ করে সংঘাত, জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট এবং বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালও কঠিন হতে পারে।




