ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রেনেডে ‘আত্মঘাতী’ সেনাদের প্রশংসা করলেন কিম জং–উন, পিয়ংইয়ংয়ে স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন দাবি ও তথ্য অনুযায়ী
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়া সেনাদের “আত্মত্যাগ” ও “আত্মঘাতী কৌশল” গ্রহণের জন্য প্রশংসা করেছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ জানায়, পিয়ংইয়ংয়ে নিহত সেনাদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন। এই উত্তর কোরিয়া আত্মঘাতী সেনা প্রশংসা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মঘাতী কৌশলে প্রশংসা কিমের
কিম জং–উন এক ভাষণে বলেন, যারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছেন বা আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছেন, তারা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। তাঁর মতে, “সর্বোচ্চ আনুগত্যের” প্রতীক হলো এমন আত্মত্যাগ, যা কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়াই করা হয়।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন, কিংবা আদেশ পালনে ব্যর্থ হওয়ার কষ্টে প্রাণ হারিয়েছেন—তাঁরাও পার্টির অনুগত সৈনিক ও দেশপ্রেমী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আবারও আলোচনায় এসেছে উত্তর কোরিয়া আত্মঘাতী সেনা প্রশংসা বিষয়টি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলের কিছু অংশ পুনর্দখলে সহায়তার জন্য অন্তত ১৫ হাজার সেনা পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া। ওই এলাকায় যুদ্ধ চলাকালে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি সেনা নিহত হয়েছে বলে সিউলের দাবি। তবে পিয়ংইয়ং ও মস্কো এই পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ অংশগ্রহণ রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়।
আত্মঘাতী নির্দেশনার অভিযোগ
গোয়েন্দা সংস্থা ও উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, পিয়ংইয়ং সেনাদের নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা বন্দী হওয়ার আগে আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেয়।
এমনকি সেনাদের শেখানো হয় যে শত্রুর হাতে বন্দী হওয়া রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এই কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মঘাতী কৌশল গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পিয়ংইয়ংয়ে স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ জানায়, নিহত সেনাদের স্মরণে সোমবার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটি স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন কিম জং–উন।
এই অনুষ্ঠানে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলুসভ এবং পার্লামেন্ট স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভলোদিন উপস্থিত ছিলেন। এটি দুই দেশের সামরিক ঘনিষ্ঠতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কিম জং–উনের বক্তব্যে ‘আত্মত্যাগের ব্যাখ্যা’
কিম বলেন, সেনারা কোনো পুরস্কারের আশা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ভাষায়, “তাঁরা আদেশ পালন করতে গিয়ে এমনভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, যা পার্টির প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্যের প্রতীক।”
এই বক্তব্য আবারও আলোচনায় এনেছে উত্তর কোরিয়া আত্মঘাতী সেনা প্রশংসা বিষয়টি, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর কেড়েছে।
যুদ্ধবন্দীদের বক্তব্য ও অভিযোগ
দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম এমবিসি সম্প্রতি ইউক্রেনে আটক দুই উত্তর কোরীয় সেনার সাক্ষাৎকার প্রচার করে। সেখানে এক বন্দী বলেন, তিনি আত্মঘাতী হতে না পারায় অনুতপ্ত।
তিনি বলেন, “বাকি সবাই নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছে, আমি ব্যর্থ হয়েছি।”
এই ধরনের বক্তব্য যুদ্ধক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও নির্দেশনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
২০২৪ সালের রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া চুক্তি
২০২৪ সালের জুনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং–উন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে দুই দেশ একে অপরকে সহায়তা করবে।
কিম তখন এই চুক্তিকে “এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী” বলে আখ্যা দেন। এই চুক্তির পরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণ বাড়ে।
শ্রমিক পাঠানোর প্রতিশ্রুতি
শুধু সেনাই নয়, উত্তর কোরিয়া কুরস্ক পুনর্গঠনে সহায়তার জন্য হাজার হাজার শ্রমিক পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য এবং সেনা নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে “আত্মঘাতী নির্দেশনা” বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।




