সবচে উষ্ণ মাসে এত বৃষ্টির কারণ কী, এবার হাওরে ফসলের এমন ক্ষতি কেন, ৯ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টি, হাওরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফসল নষ্ট ও কৃষকের বড় ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের হাওর অঞ্চলে ভয়াবহ ফসল ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে এপ্রিলের অতিবৃষ্টি হাওরের ফসল ক্ষতি কৃষকদের জীবন-জীবিকায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওর এলাকায় ধান কাটা অবস্থাতেই পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জমি।
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওর এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আগে বাঁধ ভেঙে ফসল নষ্ট হলেও এবার হঠাৎ বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে একই ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তার ভাষায়, আগে বাঁধ ভেঙে ফসল যেত, এখন আবার বৃষ্টির পানিতেও একই অবস্থা তৈরি হয়েছে—যা আগে কখনও হয়নি।
হাওর অঞ্চলের হাজারো কৃষকের মূল ভরসা বোরো ধান। এই একমাত্র ফসলের ওপরই বছরের পুরো খাদ্য ও আয় নির্ভর করে। কিন্তু এবার অতিবৃষ্টি, উজানের ঢল এবং পাহাড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাওরে এপ্রিলের অতিবৃষ্টি হাওরের ফসল ক্ষতি ভয়াবহ রূপ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাওরের সাত জেলায় প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৭১ শতাংশ ধান কাটা হলেও প্রায় ৪৬ হাজার হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। মাঠপর্যায়ের অনেক তথ্য এখনো যাচাই চলছে।
৯ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টি ও জলবায়ুর পরিবর্তন
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর এবারই এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। মাসজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ জানান, প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা-পূর্ব সময়ে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি এখন একটি নতুন প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
এছাড়া এপ্রিল মাসে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম থাকলেও বৃষ্টির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা কৃষিকাজের জন্য অনুকূল ছিল না।
কৃষকের জীবন ও হাওরের সংকট
হাওরের কৃষক রফিকুল ইসলামের মতো হাজারো কৃষকের জীবন পুরোপুরি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, একদিকে বাঁধ ভাঙে, অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে জমি ডুবে যায়—এ ধরনের পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি।
এ বছর অনেক কৃষক ধান কাটার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে যায়।
দেশের অন্যান্য এলাকায়ও ক্ষতি
শুধু হাওর নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, খাগড়াছড়ি, গাইবান্ধা ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় তরমুজ, মুগ ডাল, বাদাম, মরিচ, সূর্যমুখী ও বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পটুয়াখালীতে মুগ ডালের বড় অংশ নষ্ট হয়েছে, বরগুনায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। খাগড়াছড়ি ও গাইবান্ধায় ধানগাছ শুয়ে পড়েছে বৃষ্টির পানিতে।
হাওরের বাঁধ ও পানিনিষ্কাশন সংকট
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এবারের ক্ষতির পেছনে শুধু বৃষ্টি নয়, হাওরের তলদেশ ও নদী-নালা পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়াও বড় কারণ।
কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক স্থানে অবৈধ স্থাপনা ও সড়ক নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশনে বাধা তৈরি হয়েছে, ফলে পানি সহজে নামতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডল বলেন, হাওরের ভূপ্রকৃতি এখন আর আগের মতো নেই। মানবসৃষ্ট পরিবর্তন এবং অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু কৃষির ওপর নির্ভর না করে হাওর অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে হবে এবং বিকল্প জীবিকা খুঁজতে হবে।
এপ্রিলের অতিবৃষ্টি হাওরের ফসল ক্ষতি নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওরের ফসল রক্ষায় শুধু বাঁধ নির্মাণ যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে নদী ও জলাশয় পুনঃখনন, জলপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন কৃষি কৌশল গ্রহণ জরুরি।




