ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা নেই তেহরানের চুক্তির বিষয়ে আন্তরিক হলেই আলোচনা, চুক্তিতে আন্তরিক না হলে আলোচনা নয়—জানুন বিস্তারিত।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা অচলাবস্থা আরও গভীর হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের কোনো আস্থা নেই, এবং যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিষয়ে আন্তরিক হলে তবেই আলোচনায় বসতে আগ্রহী ইরান।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা থাকলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা কার্যত স্থগিত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আরাগচির বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ওয়াশিংটনের ওপর আস্থাহীনতা: কেন এমন অবস্থান?
আরাগচি স্পষ্ট করে বলেন,

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার ‘সাংঘর্ষিক বার্তা’ আসায় তেহরানের মধ্যে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, প্রকৃত উদ্দেশ্য পরিষ্কার না হওয়ায় আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে না।
গত কয়েক মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা শুরু হলেও প্রতিবারই তা থেমে গেছে। ইরানের অভিযোগ, আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালিয়ে প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
আরাগচি বলেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, তারা হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। তবে এর জন্য ইরানের নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাধ্যতামূলক।
এই প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে হয়।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর-এর সঙ্গে আলোচনায় ইরান তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ব্রিকস সম্মেলন ও কূটনৈতিক বার্তা
ভারত সফরে গিয়ে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন আরাগচি। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির অবস্থা ‘খুবই জটিল’।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিলেও নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।
আলোচনায় অচলাবস্থা: কোথায় সমস্যা?
ইরান যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা অচলাবস্থা আরও জটিল কেন
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য কমেনি। গত সপ্তাহে উভয় পক্ষই একে অপরের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে আরাগচি জানান, এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়নি—বরং একটি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে প্রধান বিরোধের বিষয়গুলো হলো:
- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
- হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
আরাগচির বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের প্রতি তার ধৈর্যের সীমা শেষের দিকে।
তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং-এর সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন বলেও জানান।
এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
চীনের ভূমিকা ও ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি
চীনের মধ্যস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে আরাগচি বলেন, যেকোনো দেশ যদি সমাধানে সহায়তা করতে চায়, ইরান তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
তিনি আরও বলেন, চীনের সঙ্গে ইরানের কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো এবং বেইজিংয়ের উদ্দেশ্য ইতিবাচক বলেই তারা বিশ্বাস করে।
যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা
ইরান বর্তমানে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাতে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রয়োজনে আবারও যুদ্ধে ফিরতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন আরাগচি।
তার মতে, আলোচনায় অগ্রগতি হলে হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি নিরাপদ করা সম্ভব হবে এবং দ্রুত নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করা যাবে।
এই সংকট শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর এর বড় প্রভাব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।




