যে ভুলে প্রথম অ্যালবামের নামই হারিয়ে ফেলেছিল ওয়ারফেজ, ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম ঘিরে ৩৫ বছরের বিস্ময়কর ইতিহাস জানুন। ভুলে নাম হারানো থেকে সমালোচনা জয়—ওয়ারফেজের দুর্দান্ত যাত্রা আজ বিশ্ব সংগীত দিবসে
বাংলাদেশের জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ওয়ারফেজের ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ২১ জুন, ঢাকায় সারগাম স্টুডিওর মাধ্যমে। বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে সেই ঐতিহাসিক অ্যালবামের ৩৫ বছরের স্মৃতি, ভুল, সাফল্য এবং সমালোচনার গল্প নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অ্যালবামটি শুধু একটি সংগীত প্রকাশনা ছিল না, বরং বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম: নাম হারানোর অদ্ভুত ঘটনা

১৯৯১ সালের ২১ জুন, ঈদুল আজহার মাত্র তিন দিন আগে ১০টি গান নিয়ে প্রকাশিত হয় এই অ্যালবামটি। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী অ্যালবামের নাম ছিল “বিচ্ছিন্ন আবেগ বাই ওয়ারফেজ”।
কিন্তু ছাপাখানার ব্যস্ততা ও ডিজাইনারের ভুলের কারণে কভার থেকে “বিচ্ছিন্ন আবেগ” অংশটি বাদ পড়ে যায়। ফলে কভারে শুধু “ওয়ারফেজ” নামটিই ছাপা হয়। এমনকি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও বাদ পড়ে যায়।
ব্যান্ডের দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপু সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, অ্যালবামের নাম রাখা হয়েছিল সাইড-এ’র তৃতীয় গান “বিচ্ছিন্ন আবেগ”-এর নাম অনুসারে। সবকিছু ঠিক থাকলেও কভার হাতে পাওয়ার পর তারা দেখেন, মূল নামটাই নেই। এই ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত কষ্টদায়ক বলে উল্লেখ করেন।
বাংলা রক ইতিহাসে ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবামের প্রভাব
এই অংশটি বাংলা রক ইতিহাসে ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম–কে আলাদা করে চিহ্নিত করে।
অ্যালবাম প্রকাশের আগে ওয়ারফেজ মূলত ইংরেজি গান করত। কিন্তু বাংলা ভাষায় প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর শ্রোতাদের সামনে এক নতুন অভিজ্ঞতা হাজির হয়।
অ্যালবামের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ছিল—
- “একটি ছেলে”
- “বসে আছি”
- “স্বাধিকার”
- “বিচ্ছিন্ন আবেগ”
এই গানগুলো দ্রুত শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাংলা রক সংগীতে নতুন ঢেউ সৃষ্টি করে।
ঈদের দিন থেকেই ছড়িয়ে পড়ে গান
টিপুর ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যালবাম প্রকাশের পর থেকেই ঈদের দিন থেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের গান বাজতে শুরু করে।
তিনি জানান, এমনও হয়েছে যে তারা নিজেরাই কোনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের গান শুনছেন, কিন্তু কেউ তাদের চিনতে পারছে না। সেই সময়টিকে তিনি “ঘোরের মতো অভিজ্ঞতা” বলে বর্ণনা করেন, যা প্রায় ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত চলেছিল।
রেকর্ডিং স্টুডিওর রাত-দিনের গল্প
অ্যালবামটি রেকর্ড করা হয় ঢাকার বিজয়নগরের সারগাম স্টুডিওতে। দিন-রাত কাজ করে গানগুলো তৈরি করা হয়েছিল।
এই অ্যালবামের সব কটি গানের কিবোর্ড বাজিয়েছিলেন রাসেল আলী, যা পরবর্তীতে ব্যান্ডের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
রাসেল আলীর এক টেক বাজিতে জয়ের গল্প
রেকর্ডিং চলাকালে “নিস্তব্ধতা” গানের একটি কিবোর্ড অংশ নিয়ে একটি মজার বাজি হয়। শর্ত ছিল—রাসেল যদি এক টেকেই অংশটি বাজাতে পারেন, তবে সবাইকে নাইট অ্যাঙ্গেল চায়নিজ রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাসেল আলী এক টেকেই অংশটি বাজিয়ে দেন এবং বাজিতে জিতে যান। পরে পুরো দল স্যুপ, ফ্রাইড রাইস, ভেজিটেবল ও ফ্রাইড চিকেন খেয়ে ৪৫০ টাকার বিল দেন।
সমালোচনার মুখে ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম
প্রকাশের পর ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি তীব্র সমালোচনাও হয়।
অনেক প্রবীণ শিল্পী ও সংগীতবোদ্ধা মন্তব্য করেন—
- “এটা গান নয়, চিৎকার-চেঁচামেচি”
- “কথা বোঝা যায় না”
- “শুধুই মিউজিক”
তবে সময়ের সঙ্গে সেই সমালোচনা বদলে যায়। ব্যান্ডের সদস্যরা জানান, শুরুতে বাংলা রক সহজভাবে গ্রহণ না হলেও পরে একই সমালোচকেরাই তাদের গানের প্রশংসা করেন।
ব্যান্ড সদস্যদের প্রথম লাইনআপ
প্রথম অ্যালবামের সময় ওয়ারফেজের লাইনআপ ছিল—
- সঞ্জয় (ভোকাল)
- টিপু (ড্রামস)
- কমল (গিটার)
- মাসুক (গিটার)
- রাসেল আলী (কিবোর্ড)
- বাবনা (বেজ ও ভোকাল)
এই লাইনআপই বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
আজ বিশ্ব সংগীত দিবসে দাঁড়িয়ে ওয়ারফেজ প্রথম অ্যালবাম শুধু একটি সংগীত প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের রক ইতিহাসের একটি মাইলফলক। ভুল, সংগ্রাম, সমালোচনা এবং জনপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে অ্যালবামটি আজও শ্রোতাদের মনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।





