ইন্টারপোলের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় ৫৯ বাংলাদেশি রয়েছেন। হত্যা, জালিয়াতি, মানবপাচারসহ নানা অভিযোগে তাদের খুঁজছে বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশ।
আন্তর্জাতিক পুলিশিং সংস্থা ইন্টারপোলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খোঁজ করা ‘ওয়ান্টেড’ ব্যক্তিদের তালিকায় বর্তমানে ৫৯ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। হত্যা, জালিয়াতি, মানবপাচার, অস্ত্র ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশ এসব ব্যক্তিকে খুঁজছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নামে রেড নোটিশ জারির বিষয়টি আলোচনায় আসার পর ইন্টারপোলের কার্যক্রম ও ওয়ান্টেড তালিকা নতুন করে জনমনে আগ্রহ তৈরি করেছে।
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট ৬ হাজার ৪৪২ জন ব্যক্তি ‘ওয়ান্টেড’ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যেই রয়েছে ৫৯ জন বাংলাদেশির নাম।
ইন্টারপোল কী এবং কীভাবে কাজ করে?
INTERPOL বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৬টি দেশ এই সংস্থার সদস্য।
সংস্থাটির মূল কাজ হলো বিভিন্ন দেশের পুলিশ ও অপরাধ তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বয় সাধন করা। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে ইন্টারপোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকায় ৫৯ বাংলাদেশি

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় থাকা ৫৯ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে বাংলাদেশ সরকার খুঁজছে, আবার কিছু বাংলাদেশিকে খুঁজছে বিদেশি রাষ্ট্র।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রেড নোটিশপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ, সব রেড নোটিশধারীর নাম প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের স্বার্থে বা অভিযুক্তকে গা-ঢাকা দেওয়ার সুযোগ কমাতে নাম গোপন রাখা হয়।
সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি। তবে তার নাম প্রকাশ্য ওয়ান্টেড তালিকায় প্রদর্শিত হয়নি।
বিদেশি রাষ্ট্র যেসব বাংলাদেশিকে খুঁজছে
বিদেশের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও একাধিক বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের অনুসন্ধান
চাঁদপুর সদরের রাজু ঢালীকে হত্যা মামলার অভিযোগে খুঁজছে সিঙ্গাপুর।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইসওয়াতানির অনুসন্ধান
আফ্রিকার দেশ ইসওয়াতানি হত্যার অভিযোগে ঢাকার মো. মিলন এবং লিটন ব্যাপারীকে খুঁজছে।
একই ধরনের অভিযোগে নোয়াখালীর মিজান মিয়াকে খুঁজছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
ভারতের অনুসন্ধানে একাধিক বাংলাদেশি
মুদ্রা জালিয়াতির অভিযোগে ভারত খুঁজছে খুলনার আজিজুর রহমান, অজয় বিশ্বাস ও তরিকুল ইসলামকে।
এ ছাড়া নোয়াখালীর সবুজ, গোপালগঞ্জের আব্দুল আলীম শরীফ, নারায়ণগঞ্জের মনির ভূঁইয়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শফিক উলও ভারতের অনুসন্ধান তালিকায় রয়েছেন।
বেলজিয়াম ও মালয়েশিয়ার অনুসন্ধান
ইউরোপের দেশ বেলজিয়াম হত্যার অভিযোগে লক্ষ্মীপুরের খোরশেদ আলমকে খুঁজছে।
অন্যদিকে চোরাচালানের অভিযোগে নাটোরের সিরাজ মোস্তফা এবং হত্যার অভিযোগে ফেনীর আলা উদ্দিনকে খুঁজছে মালয়েশিয়া।
মালদ্বীপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধান
তছরুপের অভিযোগে হানিফকে খুঁজছে মালদ্বীপ।
যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে জাহিদুল ইসলাম এবং অস্ত্র মামলায় ফজলুল আমীন জাভেদকে খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র।
বাংলাদেশ যাদের খুঁজছে
হত্যা মামলার আসামিরা
বাংলাদেশ সরকারের অনুসন্ধান তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ হত্যা মামলার অভিযুক্ত।
তাদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাটের রবিউল ইসলাম, টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ তাজউদ্দীন ও বাবু আহমেদ রাতুল, চট্টগ্রামের ইউসুফ ও সাজ্জাদ হোসেন খান, ফরিদপুরের নাইম খান ইকরাম, বগুড়ার কালা জাহাঙ্গীর ফেরদৌস, গাজীপুরের নুরুল দীপু ও আহাম্মেদ মজনু, কুমিল্লার খন্দকার আব্দুর রশীদ ও রাশেদ চৌধুরী।
এ ছাড়া ঢাকার নুর চৌধুরী, নবী হোসাইন, জিসান আহমেদ, তৌফিক আলম, প্রকাশ কুমার, জাফর আহমেদ, সালাউদ্দিন মিন্টু, নাজমুল আনসার ও শরীফুল হক ডালিমও হত্যা মামলায় অনুসন্ধানভুক্ত।
তালিকায় আরও রয়েছেন খুলনার শরীফুল হোসাইন, চট্টগ্রামের আমিনুর রসুল, নেত্রকোনার আব্দুল জাব্বার, বরিশালের গোলাম ফারুক অভি, মুন্সীগঞ্জের রফিকুল ইসলাম, খুলনার হারুন শেখ, নরসিংদীর মোসলেম উদ্দিন খান এবং গাইবান্ধার চন্দন কুমার রায়।
মানবপাচার ও অন্যান্য অভিযোগ
মানবপাচারের অভিযোগে কিশোরগঞ্জের জাফর ইকবাল, স্বপন, মিন্টু মিয়া ও তানজীরুল এবং মাদারীপুরের মোল্লা নজরুল ইসলামকে খুঁজছে বাংলাদেশ।
পর্নোগ্রাফির অভিযোগে টাঙ্গাইলের ওয়াসিম, অস্ত্র মামলায় গিয়াস উদ্দিন, নির্যাতনের মামলায় চট্টগ্রামের অশোক কুমার দাশ এবং জালিয়াতির অভিযোগে জামালপুরের আমানুল্লাহ শফিক ও আতাউর রহমানও অনুসন্ধান তালিকায় রয়েছেন।
এ ছাড়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত জাহিদ হোসেন খোকন, সৈয়দ মো. হাছান আলী, আবুল কালাম আজাদ ও সৈয়দ মো. হোসেনকেও খুঁজছে বাংলাদেশ সরকার।
ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকায় ৫৯ বাংলাদেশি: রেড নোটিশ ও ওয়ান্টেড তালিকার পার্থক্য
রেড নোটিশ এবং প্রকাশ্য ওয়ান্টেড তালিকা এক বিষয় নয়। রেড নোটিশ হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে কোনো অভিযুক্ত বা পলাতক ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত ও আটক সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা।
অন্যদিকে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় নির্বাচিত কিছু মামলার তথ্য প্রকাশ করা হয়। ফলে কোনো ব্যক্তির নামে রেড নোটিশ থাকলেও তার নাম প্রকাশ্য তালিকায় নাও থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে সমন্বয়ের গুরুত্ব
বিশ্বায়নের যুগে অপরাধীরা সহজেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া অনেক অপরাধ তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় ইন্টারপোলের মতো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে অপরাধীদের খুঁজে বের করার কাজে সহায়তা করে।





