নেইমারের কান্না আমার মন ভেঙে দিয়েছে: সাফা কবির, ব্রাজিল বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে জানালেন গ্যালারির আবেগ, নেইমারের কান্না ও প্রিয় দলের ম্যাচ দেখার স্মরণীয় মুহূর্তের গল্প।
অভিনয়শিল্পী ও মডেল সাফা কবির জানিয়েছেন, সাফা কবির ব্রাজিল বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ও নরওয়ের ম্যাচ সরাসরি গ্যালারিতে বসে দেখার পর তিনি জানিয়েছেন মাঠের পরিবেশ, ব্রাজিলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং ম্যাচ শেষে নেইমারের কান্নার দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
নিউইয়র্ক থেকে যাত্রা করে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন সাফা কবির। তাঁর ভাষ্যে, টেলিভিশনে দেখা বিশ্বকাপ আর গ্যালারিতে বসে অনুভব করা বিশ্বকাপের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, মাঠের উত্তেজনা এবং প্রিয় দলের প্রতি মানুষের আবেগ তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
সাফা কবির ব্রাজিল বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা: গ্যালারিতে হলুদ জার্সির উৎসব
সাফা কবির জানান, নিউইয়র্কের কুইন্স থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ম্যাচের টিকিটের সঙ্গে শাটল সার্ভিস থাকায় তিনি ম্যানহাটানের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে চারপাশে অসংখ্য ব্রাজিল সমর্থককে হলুদ জার্সি পরা অবস্থায় দেখতে পান।

তিনি বলেন, নিউইয়র্কে থাকা অনেক কলম্বিয়ান সমর্থকও ব্রাজিলকে সমর্থন করছিলেন। ব্রাজিলের জার্সি পরায় রাস্তায় অনেকেই তাঁকে দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। সমর্থকদের মধ্যে জয় নিয়ে ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস।
স্টেডিয়ামে প্রবেশের পরও একই চিত্র দেখা যায়। চারদিকে ছিল ব্রাজিলের হলুদ জার্সির আধিপত্য। সাফার মতে, গ্যালারির প্রায় ৭০ শতাংশ দর্শক ব্রাজিলের পক্ষে ছিলেন। বাকি অংশে ছিলেন নরওয়ের সমর্থকরা।
মাঠের পরিবেশ নিয়ে তিনি জানান, কেউ গান গাইছিলেন, কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন, আবার কেউ ছবি তুলছিলেন। পুরো আয়োজনটি তাঁর কাছে একটি উৎসবের মতো মনে হয়েছিল।
ব্রাজিলের হারেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাবাদী ছিলেন সাফা
ম্যাচে নরওয়ের হয়ে আর্লিং হলান্ড গোল করার পরও ব্রাজিলের জয় নিয়ে আশা ছাড়েননি সাফা কবির। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ব্রাজিল শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সাফা জানান, ম্যাচের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আশা করেছিলেন ব্রাজিল কোনোভাবে সমতা ফেরাবে। এমনকি ম্যাচ টাইব্রেকারে গেলে ব্রাজিল জয় পেতে পারে বলেও তাঁর মনে হয়েছিল।
একজন সমর্থক হিসেবে প্রিয় দলের জন্য তাঁর এই অপেক্ষা এবং বিশ্বাস ফুটবলের প্রতি তাঁর আবেগকে তুলে ধরে।
ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা ছোটবেলার স্মৃতি থেকে
সাফা কবিরের ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসার শুরু ২০০২ সালের বিশ্বকাপ থেকে। তখন তিনি খুব ছোট ছিলেন। ফুটবলের নিয়ম-কানুন পুরোপুরি না বুঝলেও বিশ্বকাপ এবং ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের বিষয়টি তাঁর মনে দাগ কাটে।
তিনি জানান, ২০০২ বিশ্বকাপের পর তাঁর এলাকার অনেক শিশুকে ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার রোনালদোর মতো হেয়ারস্টাইল করতে দেখেছিলেন। সেই সময় রোনালদো ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় আকর্ষণ।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশ্বকাপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বের সেরা দলগুলো কেন এই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়—এসব বিষয় তাঁকে আরও আকৃষ্ট করে।
বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপে খেলতে পারে না—এমন প্রশ্নও তাঁর মনে তৈরি হয়েছিল। সেই কৌতূহল থেকেই বিশ্বকাপের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
বিশ্বকাপের গ্যালারিতে বসার স্বপ্ন পূরণ
সাফা কবির জানান, ২০২২ সালে যখন জানতে পারেন ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে, তখন থেকেই তিনি পরিকল্পনা শুরু করেন।
ভিসা, টিকিট এবং বিশ্বকাপের অংশ হওয়ার সুযোগ—সবকিছু নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। তবে টিকিট পাওয়া সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়।
প্রিয় দল ব্রাজিলের ম্যাচ সরাসরি গ্যালারিতে বসে দেখা তাঁর জন্য বিশেষ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
সাফা কবির ব্রাজিল বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে নেইমারের কান্নার কথা
ম্যাচ শেষে নেইমারের কান্নার দৃশ্য সাফা কবিরকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে। তিনি বলেন, নেইমারের কান্না তাঁর মন ভেঙে দিয়েছে।
সাফার মতে, নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগের অংশ। তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও প্রতিভা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের একজন করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, নেইমারের এটি শেষ বিশ্বকাপ কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য বিষয়টি অনেক বেদনাদায়ক হবে।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিল সমর্থকদের কান্না এবং হতাশাও তাঁকে স্পর্শ করেছে। কারণ, একজন সমর্থক হিসেবে তিনিও সেই কষ্ট অনুভব করেছেন।
হলান্ডের প্রতি মুগ্ধতা ও ব্রাজিল সমর্থকের দ্বন্দ্ব
সাফা কবির আর্লিং হলান্ডের খেলারও বড় ভক্ত। তাঁর মতে, হলান্ড একজন অসাধারণ পারফরমার এবং তাঁর মাঠের আচরণ প্রশংসার যোগ্য।
হলান্ডের সঙ্গে দেখা হলে তিনি তাঁকে অভিনন্দন জানাতেন বলে জানান। তাঁর মতে, হলান্ডের গতি, আত্মবিশ্বাস এবং শান্ত স্বভাব একজন ফুটবলারের জন্য অনুকরণীয়।
তবে ব্রাজিল সমর্থক হিসেবে হলান্ডের গোল তাঁকে আনন্দ দিতে পারেনি। কারণ, সেই গোলটি এসেছিল তাঁর প্রিয় দলের বিপক্ষে।
ব্রাজিলের বর্তমান দল নিয়ে সাফার মূল্যায়ন
সাফা কবির মনে করেন, বর্তমান ব্রাজিল দলে আগের মতো সেই পরিচিত জাদু কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে।
তিনি রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা এবং রবার্তো কার্লোসদের সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, তখন দলের মধ্যে অসাধারণ সমন্বয় ছিল।
গ্যালারির ওপর থেকে পুরো ম্যাচ দেখার সুযোগ হওয়ায় দলের কিছু দুর্বলতা তাঁর চোখে আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে আরও ভালো প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তবে তিনি বিশ্বাস করেন, ব্রাজিলের সামনে এখনো সম্ভাবনা রয়েছে। ভালো প্রস্তুতি নিয়ে দল ভবিষ্যতে আবার নিজেদের পুরোনো ছন্দে ফিরতে পারে।
বাংলাদেশি পতাকায় ব্রাজিল সমর্থকদের ভালোবাসা
স্টেডিয়ামে সাফা কবির বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। আশপাশের অনেক ব্রাজিল সমর্থক পতাকাটি দেখে বাংলাদেশের পরিচয় জানতে চান।
তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলের খেলা দেখতে এসেছেন শুনে অনেকেই তাঁকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। কেউ কেউ বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার কথাও বলেন।
এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বিশেষভাবে আনন্দ দিয়েছে।
সাফা কবির ব্রাজিল বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা থাকবে আজীবন স্মৃতিতে
সাফা কবিরের কাছে এই ম্যাচ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং বহু বছরের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত।
তিনি মনে করেন, গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার অনুভূতি টেলিভিশনে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। সমর্থকদের আবেগ, মাঠের পরিবেশ এবং সরাসরি খেলা দেখার উত্তেজনা আলাদা।
ফলাফল প্রত্যাশামতো না হলেও এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অমূল্য হয়ে থাকবে বলে জানান তিনি।
বিশ্বকাপ, ব্রাজিল এবং ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসার গল্প ভবিষ্যতেও তিনি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান।





