আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (1)
গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের সঙ্গে ন্যাটোর টানাপোড়েন, হুঁশিয়ারি ডেনমার্কের
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইসরায়েলকে পরিত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত, বাড়ল তেলের দাম
Untitled design (21)
ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে আলোচনায় আনতে চীনকে নরওয়ের আহ্বান
Untitled design (11)
ফিলিপাইনের ভাইস প্রেসিডেন্টের অভিশংসন বিচার শুরু আজ

চাইলেই ট্রাম্প কেন ইরান যুদ্ধ থেকে রাতারাতি বের হতে পারছেন না

চাইলেই ট্রাম্প কেন ইরান যুদ্ধ থেকে রাতারাতি বের হতে পারছেন না, ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন সংকটে পড়েছেন। পাল্টাপাল্টি হামলা, তেলবাজার ও শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ থেকে দ্রুত বের হওয়ার পথ খুঁজলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ায় যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ বাধার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন এমন কোনো সহজ পথ নেই, যা তাকে সম্মানজনকভাবে এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।

সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। এরপর ট্রাম্প জানান, সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে করা অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যকারিতা হারিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানে নতুন হামলার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় শুধু যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির পথও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে কেন তৈরি হয়েছে নতুন সংকট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। তবে চুক্তি হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যেই আবারও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাব্য পথ থাকলেও প্রতিটি পথেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। সামরিক অভিযান চালিয়ে গেলে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে। আবার দ্রুত পিছু হটলেও ইরান সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

গতকাল ট্রাম্প দাবি করেন, উত্তেজনা দ্রুত শেষ হতে পারে। তবে নতুন হামলার কারণে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে গেছে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাড়ছে উত্তেজনা

ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান ভিন্ন।

যুদ্ধের সময় ইরান দেখিয়েছে, তারা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা রাখে। ইরানের দাবি, ভবিষ্যতে এই নৌপথ পরিচালনায় তাদের বড় ভূমিকা থাকা উচিত। এমনকি সেখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর আরব মিত্ররা চান, হরমুজ প্রণালি সবার জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত থাকুক।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক জন অলটারম্যান বলেন, ইরান বুঝতে পেরেছে যে ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চান না। পাশাপাশি আরব দেশগুলোও দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে চায়।

তার মতে, ট্রাম্প কয়েক দিন সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন, তবে পরিস্থিতি শান্ত করতে শেষ পর্যন্ত আরব দেশগুলোর চাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্পের সামনে কূটনৈতিক ও সামরিক সীমাবদ্ধতা

ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সমাধানে পৌঁছানো। তিনি মনে করেছিলেন, সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী বড় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নাও হতে পারে।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্প এমন একটি পরিস্থিতিতে পড়েছেন যেখানে সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো পথেই ইরানের কাছ থেকে বড় অর্জন পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

হোয়াইট হাউসের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ: রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে

ট্রাম্পের জন্য শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।

এই যুদ্ধে ইরানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে।

২৩ জুনের রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সর্বনিম্ন।

এর ফলে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা কেন অনিশ্চিত

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। সেখানে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। কারণ, সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু জটিল বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এখন নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পরবর্তী আলোচনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির জন্য দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিল করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী চুক্তিতে এটিই ছিল ইরানের অন্যতম বড় অর্জন।

তবুও কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের নেতারা নতুন হামলার চাপ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।

বিশ্লেষকদের চোখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নাও নিতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা চলতে পারে।

অর্থাৎ স্থায়ী সমাধান ছাড়াই বারবার উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে।

ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি বিদেশে নতুন যুদ্ধ এড়িয়ে চলবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মনোযোগ দেবেন।

তিনি ইরানের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে ইরানও নিজেদের সাফল্য হিসেবে বিষয়টি প্রচার করছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প আগে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি করেছিলেন। এখন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে তিনি নিজেই একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন।

অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্পের উদ্বেগ

জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস ট্রাম্পকে ভাবাচ্ছে।

তার মতে, ট্রাম্প জানেন যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

যদি যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যায়, তাহলে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ট্রাম্প নিজেও একসময় মন্তব্য করেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থাও হুভারের মতো হতে পারে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের মহামন্দার সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

সর্বাধিক পঠিত