যুক্তরাষ্ট্রে ৬ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় ঘটনা, আইস এজেন্টের গুলিতে অভিবাসী নিহত। মেইনে গুলির ঘটনা, তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য জানুন।
যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যের বিডেফোর্ড শহরে আইস অভিযানের সময় এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, গাড়ি থামানোর চেষ্টা করার সময় ওই ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করলে জননিরাপত্তার স্বার্থে এক আইস কর্মকর্তা গুলি চালান। তবে ঘটনাটি নিয়ে সরকারি তথ্য সীমিত থাকায় নিহত ব্যক্তির পরিচয়, পরিস্থিতি এবং গুলি চালানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইস অভিযানে অভিবাসী নিহত হওয়ার এই ঘটনা ঘটে টেক্সাসে একই ধরনের আরেকটি ঘটনার মাত্র ছয় দিন পর। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি ব্যবহারের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
মেইনে আইস অভিযানে গুলির ঘটনা কীভাবে ঘটল

ডিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল প্রায় ৭টার দিকে (ইডিটি) মেইনের বিডেফোর্ড শহরে ঘটনাটি ঘটে। শহরটি মেইনের বৃহত্তম নগরী পোর্টল্যান্ড থেকে প্রায় ১৫ মাইল (২৪ কিলোমিটার) দক্ষিণে অবস্থিত।
ডিএইচএস জানিয়েছে, আইস কর্মকর্তারা এমন একজন ব্যক্তির সর্বশেষ পরিচিত ঠিকানায় নজরদারি চালাচ্ছিলেন, যার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত আদেশ ছিল।
সংস্থার দাবি, নজরদারির সময় একজন অভিবাসী ওই বাড়ি থেকে একটি গাড়ি নিয়ে বের হন। পরে কর্মকর্তারা তাকে অনুসরণ করার সময় গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
তবে ডিএইচএস স্পষ্ট করেনি, গাড়িতে থাকা ব্যক্তিই সেই ব্যক্তি ছিলেন কি না, যার ঠিকানা নজরদারির আওতায় ছিল। এছাড়া ওই ব্যক্তি কীভাবে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছিলেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
আইস অভিযানে অভিবাসী নিহত ঘটনায় সরকারি তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
Reuters-এর প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মেইনের ঘটনার বিষয়ে সরকারি বক্তব্য খুব সীমিত ছিল। বিডেফোর্ড পুলিশ বিভাগ এবং এফবিআই ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্তে অংশ নেয়।
মেইনের মার্কিন সিনেটর অ্যাঙ্গাস কিং জানান, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এক কর্মকর্তা তাকে বলেছেন, নিহত ব্যক্তি বিশোর্ধ্ব এক যুবক ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি গাড়িকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করেছিলেন।
তবে পরে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়, নিহত ব্যক্তি আসলে সেই অভিবাসন পরোয়ানার লক্ষ্য ছিলেন না। সিনেটর কিং বলেন, তদন্তের মূল বিষয় হওয়া উচিত ছিল—নিহ ব্যক্তি সত্যিই আইস কর্মকর্তাদের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছিলেন কি না এবং গুলি চালানোর প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না।
তিনি বলেন, ব্যক্তির অভিবাসন অবস্থার চেয়ে গুলি চালানোর পরিস্থিতি ও কারণ খতিয়ে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অভিবাসী অধিকারকর্মীদের দাবি
অভিবাসী অধিকারকর্মীরা দাবি করেছেন, নিহত ব্যক্তি ছিলেন ২৬ বছর বয়সী এক কলম্বিয়ান নাগরিক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজের অনুমতি পেয়েছিলেন এবং তার একটি সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরও ছিল।
তবে কর্মীরা নিহত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি। তারা কীভাবে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দেননি।
এ ঘটনায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযানের সময় তথ্য যাচাই এবং বলপ্রয়োগের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না।
আইস অভিযানে অভিবাসী নিহত: যুক্তরাষ্ট্রে নতুন উদ্বেগ
আইস অভিযানে অভিবাসী নিহত হওয়ার এই ঘটনা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অভিবাসন আইন প্রয়োগ অভিযানের সময় গুলিতে নিহত মানুষের সংখ্যা অন্তত সাতজনে নিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং নির্বাসন কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আইসের অভিযান আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রয়টার্সের হাতে আসা আইসের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু থেকে মেইনে সংস্থাটির গ্রেপ্তারের সংখ্যা চার গুণের বেশি বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে মেইনে আইস প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় গুলির মুহূর্ত
বিডেফোর্ডের ৭১ বছর বয়সী বাসিন্দা ড্যানিয়েল বুশার জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি তার অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। তখন তিনি পটকা ফাটার মতো কয়েকটি শব্দ শুনতে পান।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, একটি সাদা এসইউভি একটি ছোট সাদা গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছে। পরে বাইরে এসে তিনি দেখেন, এসইউভি থেকে বের হওয়া একজন আইস কর্মকর্তা গাড়ির দরজা খুলে চালককে বের করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চালকের মুখ ও মাথায় রক্ত ছিল। বুশার দাবি করেন, তিনি আহত ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, “আমি তো গাড়ি থামানোর চেষ্টা করেছিলাম।”
এর কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তির শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় বলে তার মনে হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলে থাকা একজন কর্মকর্তাকে খুব বিচলিত ও হতবাক দেখাচ্ছিল।
ভিডিও ও তদন্তে পাওয়া তথ্য
রয়টার্স যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা গাড়িটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছিল এবং ভেস্ট পরা দুই ব্যক্তি হেঁটে গিয়ে সেটি থামানোর চেষ্টা করছেন।
তবে ভিডিওটি গুলি চালানোর আগে নাকি পরে ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রয়টার্সের তোলা একটি ছবিতে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট গাড়িটির চালকের পাশের উইন্ডশিল্ডে চারটি গুলির ছিদ্রের মতো চিহ্ন রয়েছে। পরে গাড়িটি একটি টো ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর বিডেফোর্ড শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে একটি পার্ক থেকে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের কার্যালয় পর্যন্ত মিছিল করেন।
এক পর্যায়ে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ভবনের প্রবেশপথে ঢুকে “আইস বের হয়ে যাও” এবং “তাকে ভোট দিয়ে সরাও” ধরনের স্লোগান দেন। তবে কোনো সহিংসতা বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেনি।
সোমবার সন্ধ্যায় প্রায় ২০০ জন বিক্ষোভকারী শহরে মিছিল করেন। পরে তারা একটি পার্কে মোমবাতি প্রজ্বালন করে অভিবাসীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
টেক্সাসের ঘটনার সঙ্গে মিল
মেইনের ঘটনার ছয় দিন আগে টেক্সাসের হিউস্টনে আইস অভিযানের সময় ৫২ বছর বয়সী লরেঞ্জো সালগাদো আরাউজো নিহত হন।
আইস জানিয়েছিল, সেটিও ছিল একটি লক্ষ্যভিত্তিক অভিবাসন অভিযান। সংস্থার দাবি, সালগাদো তার ভ্যান দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়িতে ধাক্কা দেন এবং একজন কর্মকর্তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
আইসের দাবি অনুযায়ী, এরপর ওই কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান। তবে সংস্থাটি তাদের বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
সমালোচকদের দাবি, অতীতেও আইস ও ডিএইচএসের কিছু প্রাথমিক বক্তব্য পরে ভিডিও ফুটেজ বা অন্যান্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আদালতেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মেইনের বিডেফোর্ড শহরে আইস কর্মকর্তাদের গুলিতে একজন অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ অভিযান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। সরকারি তথ্য সীমিত থাকায় গুলি চালানোর পরিস্থিতি, নিহত ব্যক্তির পরিচয় এবং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।





