কাতারকে কীভাবে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে গড়ে তুলেছেন প্রয়াত আমির শেখ হামাদ, সফট পাওয়ার কৌশল কাতারকে আঞ্চলিক শক্তিতে রূপ দিয়েছে। শিক্ষা, কূটনীতি ও বিনিয়োগে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা জানুন।
কাতারের সদ্য প্রয়াত সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি কীভাবে ছোট একটি দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কাতারের আমিরের কার্যালয় থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়। ৭৪ বছর বয়সে মারা যাওয়া শেখ হামাদকে দেশটির আধুনিক কূটনৈতিক ও উন্নয়ন যাত্রার অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে দেখা হয়।
দোহায় ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাব মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কাতারের বর্তমান আমির ও তাঁর ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা অংশ নেন। পরে তাঁকে দোহার উত্তরে অবস্থিত লুসাইল কবরস্থানে দাফন করা হয়।
শেখ হামাদের শাসনামলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সীমিত ভৌগোলিক আয়তনের একটি দেশকে শিক্ষা, গবেষণা, কূটনীতি, জ্বালানি ও মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলা।
শেখ হামাদের সফট পাওয়ার কৌশল: ছোট দেশ থেকে বড় প্রভাব

শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ১৯৯৫ সালে ক্ষমতায় আসার পর উপলব্ধি করেন, কাতারের প্রচলিত শক্তির উৎস সীমিত। দেশটির আয়তন ছোট হলেও এর সম্ভাবনা অনেক বড়—এই ধারণা থেকেই তিনি ‘সফট পাওয়ার’-এ গুরুত্ব দেন।
শেখ হামাদের সফট পাওয়ার কৌশল মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্রীড়া ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল কাতারের প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
এই পরিকল্পনার ফলে কাতার ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
শেখ হামাদের নেতৃত্বে কাতার শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বড় প্রকল্প গ্রহণ করে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতেও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও নির্ভর করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কাতার নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম হয়।
কূটনীতিতে কাতারের নতুন অবস্থান
শেখ হামাদের সময় কাতার শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘাত ও বিরোধ সমাধানে কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।
২০০৮ সালে লেবাননের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে দোহা চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাতার লেবাননের বিভিন্ন পক্ষকে আলোচনায় এনে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সহায়তা করে।
এছাড়া সুদানের দারফুর সংকট নিয়ে দীর্ঘ ৩০ মাসের আলোচনায় কাতার মধ্যস্থতা করে। এর ফল হিসেবে ২০১১ সালে ‘দোহা ডকুমেন্ট ফর পিস’ স্বাক্ষরিত হয়।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা
ফিলিস্তিন ইস্যুতেও কাতার দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে আসছে।
কাতার হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেন, সোমালিয়া এবং ইরিত্রিয়া ও জিবুতির মধ্যকার বিরোধ সমাধানের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
২০১২ সালে ইসরায়েলি অভিযানের পর গাজা উপত্যকা সফরকারী প্রথম আরব নেতা ছিলেন শেখ হামাদ। ওই সফরে তিনি ৪০ কোটি ডলারের অনুদানের মাধ্যমে আবাসন ও পুনর্গঠন প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দেন।
কাতারের এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার কারণে দেশটি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে। এর মধ্যে ইসরায়েলও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করা
শেখ হামাদের শাসনামলেই কাতারে আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এই ঘাঁটিতে।
একই সময়ে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতৃত্বকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি ও দোহার ভৌগোলিক নৈকট্য কাতারের কৌশলগত অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আরব বসন্ত ও আঞ্চলিক নীতি
আরব বসন্ত আন্দোলনের সময় কাতার এমন নীতি গ্রহণ করে, যা এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারের পক্ষে ছিল।
এই অবস্থান কাতারের পররাষ্ট্রনীতিকে আলাদা পরিচয় দেয়। দেশটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ, মানবিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে থাকে।
শেখ হামাদের উত্তরাধিকার ও শেখ তামিমের নেতৃত্ব
শেখ হামাদের শাসনামলে কাতারের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এটি একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিচয় তৈরি করে।
২০১৩ সালে শেখ হামাদ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান এবং তাঁর ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি কাতারের আমির হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বর্তমান আমির শেখ তামিম তাঁর বাবার উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
শেখ হামাদের সফট পাওয়ার কৌশল কাতারের জন্য এমন একটি ভিত্তি তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে দেশটি ছোট আকারের রাষ্ট্র হয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে।





