ডনের গ্রেপ্তার হওয়া নিয়ে যা বললেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ সামনে এসেছে।
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা ডন হক গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘদিনের আলোচিত এই মামলায় ডনের গ্রেপ্তারকে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডনের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পর নীলা চৌধুরী বলেন, সালমান তাঁর সন্তান এবং তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সালমানের মৃত্যুর সঙ্গে ডন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। একই সঙ্গে ছেলের মৃত্যুর পর ডন তাঁকে অপমান করেছেন এবং সালমানের নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নীলা চৌধুরী বলেন, তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ এবং বর্তমান সরকারের প্রতি তাঁর আস্থা রয়েছে। সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং একদিন তিনি সন্তানের হত্যার বিচার পাবেন—এমন আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
নীলা চৌধুরীর বক্তব্যে কী উঠে এসেছে

ডনের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে সালমান শাহর মা বলেন, তাঁর সন্তান সালমান তাঁর হৃদয়ে আছেন এবং থাকবেন। তিনি দাবি করেন, সালমানকে হত্যা করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডন জড়িত ছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সালমানের মৃত্যুর পরও ডন তাঁকে বিভিন্নভাবে অপমান করেছেন এবং তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন। ডনের গ্রেপ্তারের পর তিনি আশা প্রকাশ করেন, মামলার তদন্তে একসময় সব প্রমাণ সামনে আসবে।
নীলা চৌধুরীর বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিচারপ্রত্যাশার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, সালমান হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হোক এবং তিনি যেন একদিন তাঁর সন্তানের মৃত্যুর বিচার পান।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সালমান শাহ নামে পরিচিত, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় মারা যান।
তাঁর মৃত্যুর পর বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন।
অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়া।
তদন্তে আত্মহত্যার প্রতিবেদন, পরে মামলার মোড়
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন।
তবে সিআইডির এই প্রতিবেদন মেনে নেননি সালমান শাহর বাবা। তিনি প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন। এরপর মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত।
পরদিন, ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম হত্যা মামলা করেন।
সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন গ্রেপ্তার: মামলায় কারা আসামি
মোহাম্মদ আলমগীরের করা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে সালমান শাহর মৃত্যুর দিনের বিভিন্ন ঘটনার বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগে মৃত্যুর দিনের যে বিবরণ
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী, তাঁর স্বামী কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান।
সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। এরপর দ্রুত বাসায় ফিরে পরিবারের সদস্যরা সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সে সময় কয়েকজন নারী সালমানের হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।
সালমানের মা তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায়।
পরে তাঁকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাবার সন্দেহ থেকে হত্যা মামলা
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সালমান শাহর মৃত্যুর আগেই তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ঘটনাটিকে হত্যা বলে সন্দেহ করেছিলেন। এ কারণেই ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন।
তবে পরবর্তীতে কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
এই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের অক্টোবরে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ আসে।
দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগ
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২০ মে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্তের আবেদন করা হয়।
এরপর ২৪ মে আদালত মরদেহ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন। তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করলে আদালত সেটি নথিভুক্ত করেন।
পরবর্তী সময়ে ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপিও আদালতে দাখিল করে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ
প্রায় তিন দশক পর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে মামলার অন্যতম আসামি ডনের গ্রেপ্তার নতুন করে তদন্তের অগ্রগতি সামনে এনেছে।
ডনকে গ্রেপ্তারের পর সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে।
মামলার তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সময়ে কী তথ্য সামনে আসে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে নীলা চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি ছেলের মৃত্যুর বিচার চান এবং মামলায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার প্রত্যাশা করেন।
অপরাধ তদন্তে সিআইডির ভূমিকা সম্পর্কে বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সিআইডি বিশেষায়িত তদন্ত পরিচালনা করে এবং তদন্তে ফরেনসিক প্রমাণসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করে।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর মামলাটি আবারও আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ এবং চলতি বছর তদন্তের অংশ হিসেবে দেহাবশেষ উত্তোলনের উদ্যোগের পর এবার অন্যতম আসামি ডন গ্রেপ্তার হলেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এই গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করে বিচার পাওয়ার আশা জানিয়েছেন। তবে মামলার অভিযোগ, তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারিত হবে।





