কানাডায় দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার সতর্কতা, দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। সামারল্যান্ড-পিচল্যান্ডে হাজারো মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিম কানাডায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কানাডার দাবানল পরিস্থিতিকে গুরুতর করে তুলেছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বাল্ড রেঞ্জ দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সামারল্যান্ড, পিচল্যান্ড ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রাদেশিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
শুক্রবার প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর বাল্ড রেঞ্জের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন সামারল্যান্ড, পিচল্যান্ডসহ আশপাশের এলাকায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে।
সামারল্যান্ডের মেয়র ডগ হোমস পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, তাদের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দাবানল

বাল্ড রেঞ্জের আগুনের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে এর শিখা আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। কর্মকর্তারা জানান, আগুনের শিখা এত উঁচুতে উঠছিল যে এর প্রভাবে বজ্রপাতও সৃষ্টি হচ্ছিল। এতে নতুন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, খুব অল্প সময়ের সতর্কবার্তার মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বর্তমানে আগুন প্রায় ১৩ হাজার ৬১৮ হেক্টর বা ৩৩ হাজার ৬৫০ একর এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বলে SOURCE TEXT-এ উল্লেখ করা হয়েছে।
বাড়িঘর হারানোর আশঙ্কায় বাসিন্দারা
সামারল্যান্ডের বাসিন্দা কিগান রাডমস্কি আগুন তার বাড়ির কাছে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। বিবিসির সঙ্গে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি যে রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তার বিপরীত দিকের পাহাড়ের পেছনে গাছের মাথায় আগুন জ্বলছিল।
রাডমস্কি জানান, শুক্রবার আরও সাতজনের সঙ্গে বাড়ি ছাড়ার পর তিনি আর সেখানে ফিরতে পারেননি। এখন তার প্রধান উদ্বেগ হলো, ফিরে যাওয়ার মতো বাড়িটি আদৌ থাকবে কি না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে থেকে যাওয়া কয়েকজন প্রতিবেশী জানিয়েছেন, তাদের সড়কের অনেক বাড়ি পুড়ে গেছে। কিছু বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে বলে তিনি জানান।
রাডমস্কির কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এই অনিশ্চয়তা—নিজেদের বাড়ির কী অবস্থা হয়েছে, সেটিই তারা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না।
সামারল্যান্ড ও পিচল্যান্ডে ব্যাপক সরিয়ে নেওয়া
প্রায় ১২ হাজার মানুষের শহর সামারল্যান্ড কানাডার দাবানল-এ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। শহরটির বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষের বসবাস পিচল্যান্ডেও কিছু এলাকার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিচল্যান্ডে ৩০ বছর ধরে বসবাসকারী আর্ল কার্জ জানান, এর আগে তাদের বহুবার সরিয়ে নেওয়ার সতর্কতা দেওয়া হলেও এবারই প্রথম তাকে সত্যিই বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে স্ত্রীকে নিয়ে ওকানাগান লেকে নৌকায় থাকা অবস্থায় তিনি দেখতে পান, পরিষ্কার নীল আকাশ দ্রুত ধোঁয়ায় ধূসর হয়ে যাচ্ছে। রাত নামার পর দাবানলের ওপর কালো ধোঁয়ার বিশাল মেঘ তৈরি হয় এবং আগুন ধীরে ধীরে তার অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসে।
কার্জের ভাষায়, হ্রদ থেকে আগুনের দৃশ্যটি অবাস্তব মনে হচ্ছিল।
কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তার বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। বর্তমানে তারা কয়েক মাইল দূরে একটি ক্যাম্পারে নিরাপদে অবস্থান করছেন।
আগুনের তীব্রতা নিয়ে যা বললেন ডেভিড ইবি
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে দাবানলের তীব্রতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, একজন অগ্নিনির্বাপণ কর্মকর্তা আগুনের তীব্রতাকে একটি বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ইবি বলেন, আগুনে বাড়িঘর ও সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় কিছু মানুষ আটকা পড়েছিলেন এবং তাদের উদ্ধার করতে হয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ।
জরুরি অবস্থায় বাড়তি ক্ষমতা
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে প্রাদেশিক সরকার অতিরিক্ত কিছু ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ, প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত দাম নেওয়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
হাজারো মানুষ ও পরিচর্যা কেন্দ্রের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া
কর্মকর্তারা বলছেন, বাল্ড রেঞ্জের দাবানল এ গ্রীষ্মে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। প্রদেশজুড়ে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সামারল্যান্ডের মেয়র ডগ হোমস জানান, অনেক খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কতগুলো স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি, কারণ অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা এখনো আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা শত শত মানুষকেও নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বয়স্কদের আবাসনও রয়েছে।
তবে আগুনে মোট কতগুলো বাড়ি বা স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, সে সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পশু ও ঘোড়া সরিয়ে নিতে বিপাকে বাসিন্দারা
ওকানাগান এলাকায় অনেক ঘোড়া রয়েছে। দাবানলের কারণে এসব পশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে কানাডার সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি জানিয়েছে।
যেসব বাসিন্দা তাদের পশু সরিয়ে নিতে পারেননি, তারা কিছু ক্ষেত্রে গেট খুলে রেখেছেন, যাতে পশুগুলো নিজেরাই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে পারে।
কিছু মালিক পশুদের গায়ে বিশেষ চিহ্নও এঁকে দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো পরে পশুগুলোকে সহজে শনাক্ত করা।
বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদের নির্দেশ
সেন্ট্রাল ওকানাগান ও ওকানাগান-সিমিলকামিনের আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ, স্নপিঙ্ক’টন ইন্ডিয়ান ব্যান্ড এবং সামারল্যান্ড ও পিচল্যান্ড প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদের নির্দেশ জারি করেছে।
একই সঙ্গে কিছু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কানাডাজুড়ে দাবানলের প্রভাব
বাল্ড রেঞ্জের আগুন একক কোনো ঘটনা নয়। এ গ্রীষ্মে কানাডাজুড়ে শত শত দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
জুলাই মাসে শুধু অন্টারিওতেই প্রায় ২০০টি দাবানল জ্বলছিল বলে SOURCE TEXT-এ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দাবানলের ধোঁয়া কয়েক দিনের জন্য টরন্টোর বায়ুর মানকে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে নিয়ে যায়।
কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন এলাকাতেও পৌঁছেছিল। এর প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত
বাল্ড রেঞ্জের আগুনের কারণে সামারল্যান্ড ও পিচল্যান্ডসহ আশপাশের এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। বহু পরিবারকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িঘর, খামার ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
আগুন দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ একদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানুষ ও পরিচর্যা কেন্দ্রের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কানাডার দাবানল পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। আগুনের বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে আরও সময় লাগবে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বাল্ড রেঞ্জ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। সামারল্যান্ড ও পিচল্যান্ডসহ বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়িঘর ও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে, কানাডাজুড়ে চলমান দাবানলের ধোঁয়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকাতেও পৌঁছেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।





