আরও খবর

যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (21)
তিন জেলার ডিসি প্রত্যাহার
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (18)
কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল নিয়ে নানা প্রশ্ন
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল
প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনে শিথিল হচ্ছে প্রক্রিয়া
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (12)
ভিসার মেয়াদ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরতে হবে: আলবার্টার প্রিমিয়ার
যে কারণে বাতিল মিশরের গোল (3)
মহাসড়কে আইন ভাঙলেই ‘অটো ফাইন’

মাদকে ডুবছে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা

মাদকে ডুবছে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা,  প্রকৌশলী, ব্যারিস্টার ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন; চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ঘাটতি রয়েছে।

রাজধানীর কয়েকটি অভিজাত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীদের বিষয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উচ্চবিত্ত পরিবারের মাদকাসক্তি এখন একটি গুরুতর সামাজিক বাস্তবতা। এসব পরিবারের সন্তানদের মধ্যে কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যারিস্টার, কেউ চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, আবার কেউ প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী। তাঁদের অনেকের শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ মাদকের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ভিআইপি-সিআইপি পরিবারের সন্তানদের কেউ বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরার পর মাদকে জড়িয়েছেন। আবার কেউ বিদেশে পড়াশোনার সময় নেশায় আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে কয়েকজনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতাও তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত আইকন কেয়ার নামের একটি অভিজাত নিরাময়কেন্দ্রে চলতি মাসে ২৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একটি শিল্পগ্রুপের কর্ণধার ও এফবিসিসিআইয়ের একজন পরিচালকও রয়েছেন। তিনি অ্যালকোহল ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

উচ্চবিত্ত পরিবারের মাদকাসক্তির চিত্র যেভাবে সামনে এসেছে

নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ২৬ বছর বয়সী এক তরুণী সদ্য লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু মাদকাসক্তির কারণে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হতে পারেননি। পরে পরিবার তাঁকে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করে।

একই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ৪৪ বছর বয়সী এক নারীও অ্যালকোহল আসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর ক্ষেত্রে স্বামীর প্ররোচনায় অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়ার কথা জানা গেছে।

আরেক তরুণের মাদকাসক্তির কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনা থেমে গেছে। চীনে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার সময় তিনি মাদকে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁর মাদকাসক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারান। পড়াশোনা শেষ না করেই তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হয়। ঢাকায় ফেরার পরও নেশা থেকে বের হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।

বিদেশে পড়াশোনা ও কর্মজীবনেও প্রভাব

একজন প্রকৌশলীর ঘটনাও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপের একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নেওয়া ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছেন। সেখানে ফেডিডাস্ট, কোকেনসহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি।

দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তাঁর শরীরে বিভিন্ন জটিল রোগ দেখা দিয়েছে। ফলে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মাদক তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

রাজধানীর ট্রাস্ট কলেজের এক শিক্ষার্থীও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।

গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি বা আইইউটি থেকে পাস করা এক প্রকৌশলীও গাঁজার নেশায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু মাদকের কারণে তাঁর পেশাজীবনও থমকে গেছে।

উচ্চবিত্ত পরিবারের মাদকাসক্তি ও পারিবারিক সংকট

মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পরিবারও এর কারণে গভীর সংকটে পড়ছে।

ইয়াবায় আসক্ত এক তরুণের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দম্পতির এই সন্তান দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে। তাঁকে ঘিরে পুরো পরিবার এখন বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে।

ধানমণ্ডির শুক্রাবাদ এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে তাঁকে একাধিকবার চিকিৎসা দেওয়া হলেও সুফল পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের কারণে তাঁর শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর একটি নামকরা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের মালিকের একমাত্র ছেলেও মাদকাসক্ত। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণের পর তাঁর মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বর্তমানে সিজোফ্রেনিয়াসহ গুরুতর মানসিক জটিলতার চিকিৎসা চলছে।

আরেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সংকট মাদকাসক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়া এবং পরে দাম্পত্য কলহের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। একপর্যায়ে তীব্র নিঃসঙ্গতা থেকে তিনি মাদকে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।

বিদেশফেরত তরুণের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক যুবকও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি দেশটির একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। মাদকে জড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলেও তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া এখন অনিশ্চিত। কারণ, ডোপ টেস্টে আবার মাদকাসক্তির প্রমাণ পাওয়া গেলে সেখানে তাঁর স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ঘটনা দেখায়, মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বা পারিবারিক জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। এর কারণে শিক্ষাজীবন, পেশাগত ভবিষ্যৎ এবং বিদেশে বসবাসের সুযোগও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।

দেশে মাদকাসক্তির চিকিৎসায় বড় ঘাটতি

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সেই তুলনায় বাড়েনি।

তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি। অথচ ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন মাত্র ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।

এই ব্যবধান মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তা এসব ঘটনাতেও স্পষ্ট হচ্ছে।

মাদকাসক্তির পেছনে যেসব কারণ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন কারণে তরুণ-তরুণীরা মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। এর মধ্যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, একাকিত্ব, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অঢেল অর্থবিত্তের বিষয়টি রয়েছে।

এ ছাড়া শিক্ষার অভাব ও মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতাকেও মাদক গ্রহণের পেছনে ভূমিকা রাখা কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা।

উচ্চবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকলেও তা সব সময় পারিবারিক নিরাপত্তা বা মানসিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে না। অনুসন্ধানে উঠে আসা ঘটনাগুলোতে একদিকে যেমন অর্থ ও সুযোগের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি একাকিত্ব, পারিবারিক সংকট এবং সামাজিক পরিবেশের প্রভাবও রয়েছে।

চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন পুনর্বাসন

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু চিকিৎসার আওতায় আনলেই সমস্যার সমাধান হয় না। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কারণ, চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরিবেশ তৈরি না হলে আবার মাদকে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক অবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত পরিবারের মাদকাসক্তি নিয়ে আলোচনা শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পরিবারের সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বরং মাদকাসক্তির সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

চিকিৎসা থেকে পুনর্বাসন—দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন

অনুসন্ধানে উঠে আসা ঘটনাগুলোতে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক পরিচয় মাদকাসক্তির ঝুঁকি থেকে কাউকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখছে না। প্রকৌশলী, ব্যারিস্টার হওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী তরুণী, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী—বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ মাদকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তাই উচ্চবিত্ত পরিবারের মাদকাসক্তি মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও পুনর্বাসনব্যবস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই পুনরায় মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে মাদকাসক্তির এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, মাদক সমস্যা কোনো নির্দিষ্ট আর্থিক বা সামাজিক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থ, শিক্ষা ও পারিবারিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে একজন মানুষ মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি হলেও চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকাসক্তির সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সর্বাধিক পঠিত