কার্সের হাতকড়া পরা ভিডিও নিয়ে তোলপাড়, তদন্তে ইসিবি, পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে তাঁর খেলা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
ইংল্যান্ডের পেসার ব্রাইডন কার্সকে ডার্বির একটি নাইটক্লাব থেকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তদন্ত শুরু করেছে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। শনিবার রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সামনে আসার পর কার্সের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে তিনি খেলতে পারবেন কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সময় কার্স ইংল্যান্ড দলের দায়িত্বে ছিলেন না। তিনি ডারহামের হয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছিলেন। তবে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় থাকা ক্রিকেটার হওয়ায় ঘটনাটি ইসিবির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইসিবি জানিয়েছে, ডার্বিতে শনিবার রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে তারা অবগত এবং বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটি বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ডার্বিতে ম্যাচ শেষে কী ঘটেছিল?

প্রথম টেস্টের একাদশে জায়গা না পাওয়ায় ব্রাইডন কার্সকে ডারহামের হয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে ম্যাচটিতে ডারহাম মাত্র তিন দিনেই জয় পায়।
ম্যাচে কার্স ব্যাট হাতে ২৬ রান করেন। বল হাতে ৮২ রান খরচ করে নেন ২ উইকেট। ম্যাচ জয়ের পর সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন করতে ডার্বিতে একটি নাইটক্লাবে যান তিনি।
এরপরই ঘটে আলোচিত ঘটনা।
রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন কার্স। তাঁর দুই হাত পেছনে হাতকড়া পরানো। পুলিশ তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যাচ্ছে। ওই সময় ডারহামের সতীর্থ ম্যাথিউ পটসের সঙ্গেও তাঁকে কথা বলতে দেখা যায়।
ভিডিওটির পেছনে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক বেন স্টোকসকেও দেখা যায়। ওই ম্যাচে ডারহামের হয়ে বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন স্টোকস। পরে দ্য টেলিগ্রাফ ভিডিওটি প্রকাশ করে।
তবে ব্রাইডন কার্সের হাতকড়া ভিডিও প্রকাশ্যে এলেও তাঁকে কেন হাতকড়া পরানো হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
ইসিবির তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন কী?
ঘটনার পর ইসিবি জানিয়েছে, তারা বিষয়টি তদন্ত করছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ডার্বিশায়ার কনস্ট্যাবুলারির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ডারহাম অবশ্য কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এখন পর্যন্ত কার্সের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। ফলে ভিডিওতে দেখা পরিস্থিতির ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তদন্ত শেষ হওয়ার পরই জানা যেতে পারে, ওই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কার্সের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না।
ইসিবির তদন্তের বিষয়ে সংস্থাটির অফিসিয়াল তথ্য ও বিবৃতি দেখতে পারেন [ব্রাইডন কার্সের হাতকড়া ভিডিও সংক্রান্ত ইসিবির তথ্য]ECB-এর অফিসিয়াল তথ্য ও বিবৃতি।
পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে খেলবেন কার্স?
ঘটনাটি সামনে আসার সময় ব্রাইডন কার্স পাকিস্তানের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের প্রথম দুই টেস্টের স্কোয়াডে ছিলেন। প্রথম টেস্টে একাদশে জায়গা না পাওয়ার কারণে তাঁকে ডারহামের হয়ে কাউন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার লন্ডনে ইংল্যান্ড টেস্ট দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। এরপর লর্ডসে দুই দিন অনুশীলন করে বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু ডার্বির ঘটনার পর সেই পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইসিবির তদন্তের ফল এবং পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে।
এই মুহূর্তে কার্স দ্বিতীয় টেস্টে খেলবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
কার্সের সাম্প্রতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার
ব্রাইডন কার্স গত অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন। তবে চলতি গ্রীষ্মে এখনো কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি।
কবজি ও কনুইয়ের চোটের কারণে নিউজিল্যান্ড সিরিজে ছিলেন না তিনি। পরে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে স্কোয়াডে শেষ মুহূর্তে ডাক পান।
এরপর দ্য হান্ড্রেডে সানরাইজার্স লিডসের হয়ে খেলে নিজের ফিটনেসের প্রমাণ দেন কার্স। সেই পারফরম্যান্সের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াডে জায়গা করে নেন তিনি।
ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তির তালিকাতেও কার্সের নাম রয়েছে।
ইংল্যান্ড ক্রিকেটে মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
কার্সের ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইংল্যান্ড ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরের আচরণ এবং অ্যালকোহল সংস্কৃতি নিয়ে আগেও বিতর্ক হয়েছে।
এর আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রীষ্মের প্রথম টেস্টের পর উদযাপনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেন স্টোকস ও গাস অ্যাটকিনসনকে তদন্ত চলাকালে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তদন্তে নাইটক্লাবে সহিংস আচরণের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
তবে নির্দিষ্ট কিছু চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা ভঙ্গের কারণে দুজনকে লিখিত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
ইসিবির প্রকাশিত তথ্যেও ওই সময় স্টোকস ও অ্যাটকিনসনকে ঘিরে টিম প্রটোকল তদন্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
ঘটনাটির পর ইংল্যান্ডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রব কি দলকে ‘জাতীয় লজ্জা’ হিসেবে দেখানোর সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে ক্রিকেটারদের অ্যালকোহল গ্রহণ নিয়ে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের পর ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম সেই বিধিনিষেধ শিথিল করেন।
বেন স্টোকসের অবস্থান ও দলীয় সংস্কৃতির প্রশ্ন
পরবর্তী সময়ে বেন স্টোকস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। তাঁর ইঙ্গিত ছিল, রাতে বাইরে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে ইসিবির ব্যবস্থাপনা তাঁর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল।
চলতি মাসে একটি পডকাস্টে স্টোকস ইংল্যান্ড দলে অ্যালকোহল নিয়ে কোনো সমস্যা থাকার কথা অস্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, ক্রিকেট সংস্কৃতির সঙ্গে সামগ্রিকভাবে অ্যালকোহলের একটি সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, স্টোকসের কাছ থেকে আবার টেস্ট অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর জো রুটের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ইংল্যান্ড দলের মধ্যরাতের কারফিউ তুলে দেওয়া।
রুটের যুক্তি ছিল, মাঠের বাইরে খেলোয়াড়রা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো নিজেদের আচরণ করতে পারবেন—এমন বিশ্বাস তাঁর রয়েছে।
কার্সের ঘটনাটি সেই সিদ্ধান্ত ও ইংল্যান্ড দলের বর্তমান সংস্কৃতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয় টেস্টের আগে বাড়ছে চাপ
লর্ডসে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের আগে ইংল্যান্ড দলের জন্য কার্সকে ঘিরে পরিস্থিতি এখন বাড়তি আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে একজন কেন্দ্রীয় চুক্তির ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ায় বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে থাকছে না; দলের মাঠের বাইরের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কার্সের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো—ডার্বিতে শনিবার রাতে একটি ঘটনা ঘটেছে, সেটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে এবং ইসিবি বিষয়টি তদন্ত করছে।
পুলিশের বক্তব্যও এখনো বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি।
কী জানা যাচ্ছে, আর কী এখনো অজানা?
যা জানা গেছে:
- ডার্বিতে শনিবার রাতে ঘটনাটি ঘটে।
- কার্স ম্যাচ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন করতে গিয়েছিলেন।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
- ভিডিওতে কার্সকে হাতকড়া পরা অবস্থায় পুলিশ নিয়ে যেতে দেখা যায়।
- ইসিবি বিষয়টি তদন্ত করছে।
- ডারহাম কোনো মন্তব্য করেনি।
- পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে কার্সের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত।
যা এখনো পরিষ্কার নয়:
- কার্সকে ঠিক কী কারণে হাতকড়া পরানো হয়েছিল।
- পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না।
- ইসিবির তদন্তের ফল কী হবে।
- দ্বিতীয় টেস্টের জন্য তাঁকে দলে রাখা হবে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্ত ও পুলিশের বক্তব্যের পরই স্পষ্ট হতে পারে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসিবির তদন্তের ফল। পাশাপাশি ডার্বিশায়ার কনস্ট্যাবুলারির কাছ থেকেও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হতে পারে।
এর আগে পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে অনুমাননির্ভর কোনো সিদ্ধান্তে না যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের সঙ্গে কার্সের যোগ দেওয়ার কথা ছিল সোমবার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর সেই পরিকল্পনা এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে অংশগ্রহণ—দুটিই নজরে থাকবে।
কার্সের ঘটনা একই সঙ্গে ইংল্যান্ড ক্রিকেটের খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরের আচরণ, দলীয় নিয়ম এবং অ্যালকোহল সংস্কৃতি নিয়ে পুরোনো আলোচনাকেও সামনে এনেছে। এখন ইসিবির তদন্ত ও পুলিশের বক্তব্যই ঠিক করবে, ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়।
ডার্বির নাইটক্লাবের ঘটনা ঘিরে ব্রাইডন কার্সের হাতকড়া ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। ইসিবি ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। তবে কার্সকে কেন আটক করা হয়েছিল বা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে তাঁর খেলা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কার্সের ক্রিকেট ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।





