ইরানকে নিষেধাজ্ঞায় শাসনব্যবস্থার পতন হবে না, তবে অর্থনীতি ও আইআরজিসির অর্থায়নে বড় চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মাইকেল মুলরয়।
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে সক্ষম হবে না বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয়। তবে তাঁর মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের অর্থনীতি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির অর্থায়নে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব, তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করার কৌশল এবং পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে গড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন।
মুলরয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপ শুধু ইরানের ভেতরে থাকা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাও এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য শুধু ইরান নয়
মুলরয় ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর অর্থ হলো, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বা আর্থিক লেনদেনে যুক্ত তৃতীয় পক্ষের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব।
এই কৌশলের ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বা অর্থনৈতিক লেনদেনে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। বিশেষ করে চীনসহ অন্যান্য দেশ এবং ইরানের আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মুলরয় উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কেবল সরাসরি ইরানি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নয়; বরং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ রাখা তৃতীয় পক্ষগুলোকেও প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে।
‘শ্যাডো ফ্লিট’ও নিষেধাজ্ঞার আওতায়

ইরান কীভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহন ও বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, সেই অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানান মুলরয়।
বিশেষভাবে তিনি ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহরের কথা উল্লেখ করেন। নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং ইরানি তেল পাচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত এই নৌপরিবহন অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর শুধু আর্থিক চাপ তৈরির পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালানোর ব্যবস্থাগুলোকেও বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে—এমন চিত্র পাওয়া যায় মুলরয়ের বক্তব্যে।
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে?
মুলরয়ের মূল্যায়নে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব হবে না। তবে তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
বিশেষ করে আইআরজিসির অর্থায়নে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নিষেধাজ্ঞার ফলে সংগঠনটির অর্থের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখানে মুলরয়ের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—নিষেধাজ্ঞা একটি সরকারের পতন ঘটানোর নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও অর্থের প্রবাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
ফলে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও এর ফলাফলকে সরাসরি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সমান করে দেখার সুযোগ নেই বলে তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব
মুলরয় মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ানোর পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞাকে একটি বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
এর পেছনে জনমতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। মুলরয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ মার্কিন জনগণ ও জনমতের কাছে খুব বেশি জনপ্রিয় নয়।
তাই সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও আর্থিক চাপ প্রয়োগের পথকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকতে পারে—এমন বিশ্লেষণ দিয়েছেন তিনি।
সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না
তবে মুলরয় শুধু নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েই কথা বলেননি। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তাঁর সতর্কবার্তা হলো, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মিত্রদেশ অথবা কোনো মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে বর্তমান অচলাবস্থা সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
অর্থাৎ, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিস্থিতির সামরিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিষেধাজ্ঞা একদিকে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে, অন্যদিকে কোনো নতুন হামলা হলে তা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব
মুলরয়ের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা যায়—
- ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
- আইআরজিসির অর্থায়নের প্রবাহ কমে যেতে পারে।
- ইরানের সঙ্গে লেনদেন করা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
- চীনসহ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা তৃতীয় পক্ষের ওপর ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ প্রয়োগ হতে পারে।
- নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ চাপের মুখে পড়তে পারে।
- তবে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন নিশ্চিত হবে না।
ইরান পরিস্থিতিতে সামনে কী ঝুঁকি?
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুলরয়ের সতর্কবার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনার মধ্যে সম্পর্ক। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মিত্রদেশ বা মার্কিন স্থাপনায় হামলা হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তখন অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এই কারণে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মুলরয় একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নিষেধাজ্ঞার কৌশল
নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করার কৌশল নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে মুলরয়ের বক্তব্যে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন দেশ বা প্রতিষ্ঠানও যদি তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেনে যুক্ত থাকে, তাহলে তারাও সম্ভাব্য চাপের মুখে পড়তে পারে।
এ ধরনের পদক্ষেপের লক্ষ্য হতে পারে ইরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগের পরিধি সংকুচিত করা। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মুলরয় জানিয়েছেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই কৌশলের কার্যকারিতা সীমাহীন নয়। অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও তা নিজে থেকেই ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
মাইকেল মুলরয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতি ও আইআরজিসির অর্থায়নে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্ক থাকা তৃতীয় পক্ষ, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে তাঁর মতে, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বরং এর প্রভাব মূলত অর্থনৈতিক চাপ ও অর্থের প্রবাহ কমানোর ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ইরান যদি কোনো মধ্যপ্রাচ্যীয় মিত্রদেশ বা মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালায়, তাহলে বর্তমান অচলাবস্থা সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি পরিস্থিতির সামরিক গতিপথও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।





